খুলনা | শনিবার | ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ | ২২ মাঘ ১৪২৯

ট্রেজারি চালানে জমা হচ্ছে মাত্র এক হাজার টাকা চাকুরিতে যোগদান প্রত্যাশীদের মাঝে ক্ষোভ

স্বাস্থ্যগত সনদে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা নিচ্ছে খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়!

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:১৪ এ.এম | ২১ ডিসেম্বর ২০২২


স্বাস্থ্যগত সনদ নিতে সরকারি চাকুরিপ্রাপ্তদের কাছ থেকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে এক হাজার টাকা জমা হচ্ছে জানালেন খুলনার সিভিল সার্জন ডাঃ সুজাত আহমেদ। অথচ প্রত্যেকের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা। ডোপ টেস্ট ও এইচআইভিসহ ৮টি টেস্ট স্ব-উদ্যোগে করিয়ে দেবার প্রতিশ্র“তি দিয়ে জনপ্রতি সাড়ে তিন থেকে হাজার টাকা করে বাড়তি নিচ্ছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। তবে দেয়া হচ্ছে না কোন মানি রিসিট বা রশিদ। এতে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেবার অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। চাকুরিতে যোগদান প্রত্যাশীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কর্মজীবনের শুরুতেই এ ধরনের অনিয়মের মধ্যদিয়ে প্রবেশ করায় চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
সূত্রমতে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান নিয়ে অধিদপ্তরের নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনার ‘ঘ’ নম্বরে বলা হয়েছে, “নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জন প্রদত্ত স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততার সনদ/প্রত্যয়ন ও ডোপটেস্ট রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে দাখিল করতে হবে। স্বাস্থ্যগত সনদে প্রার্থী কোন দৈহিক বৈকল্যে ভুগছেন কিংবা উলি­খিত পদে নিরাময়যোগ্য নয় মর্মে উলে­খ থাকলে তিনি নিয়োগের জন্য বিবেচিত হবেন না।”
সরেজমিনে চাকুরিতে যোগদান প্রত্যাশীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নির্ধারিত তারিখের মধ্যে স্বাস্থ্য সনদ জমা দিতেই হবে। সে কারণে বাড়তি সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা নিলেও কেউ মুখ খুলছেন না। তবে চাকুরি জীবনের শুরুতেই এমন অনিয়মের মধ্যদিয়ে কর্মে প্রবেশ করায় ক্ষুব্ধ সকলেই।
ডুমুরিয়া ও দিঘলিয়া থেকে আগত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরিতে যোগদান প্রত্যাশী দু’জন অভিযোগ করে বলেন, “সিভিল সার্জন আজ অফিসে নেই। অথচ সকালে টাকা জমা দিলেই বিকেলে স্বাস্থ্য সনদ পেয়ে গেলাম। তাহলে কি আদৌ আমাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে। সকালে সাড়ে তিন হাজার টাকাই জমা দিলাম, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যে তো নমুনাও সংগ্রহ করা হলো না। সবই বুঝতেছি, কিন্তু স্বাস্থ্য সনদটাই যে এখন সোনার হরিণ; তাই কিচ্ছু বলার নেই।”
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পৌনে একটার দিকে শামসুর রহমান রোডস্থ খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে যান এ প্রতিবেদক। পরিচয় গোপন করে সিভিল সার্জনের পাশের কক্ষে যেয়ে স্বাস্থ্য সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া জানতে চান তিনি। সেখানে কর্মরত কর্মচারীরা তাকে জানান, “ডোপ টেস্ট, ব্লাড গ্র“পিং, সিএক্সআর পিএ ভিউ, ইউরিন, এইচবিএসএজি, এইচআইভি, আরবিএস, এইচসিভি, ভিডিআরএল এবং ইসিজি করাতে হবে। এই সবগুলোর প্যাকেজ করে আমরা সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা নিচ্ছি। বাইরে থেকে করলে খরচ আরও অনেক বেশি পড়বে।”
চাকুরিতে যোগদানকারী কয়েকজন শিক্ষক জানান, সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তাদের কোনো ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করেই নগদ সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা করে নেয়া হয়েছে। তাদের শুধু ‘অতীতে বড় কোনো অসুখে ভুগছেন কি না, চশমা পরেন কি না’ এমন কয়েকটি প্রশ্ন করে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ দিয়ে দিচ্ছেন। তাছাড়া টাকা নেয়া বাবদ কোনো রসিদও দেয়া হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী একাধিক নারী ও পুরুষ অভিযোগ করে জানান, নিয়ম অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে হওয়ার কথা। ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় আসলে সেখানে কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া তাদের কাছ থেকে জন প্রতি সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা করে নেয়া হচ্ছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মচারীরা তাদের কাছ থেকে সিভিল সার্জনের কথা বলে এ টাকা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তাছাড়া টাকা নেয়ার কোনো রশিদ দেয়া হয়নি কাউকেই।
খুলনা সিভিল সার্জন ডাঃ সুজাত আহমেদ বলেন, ‘স্বাস্থ্য সনদের জন্য সরকারী নিয়ম ছাড়া বাড়তি কোনো টাকা নেয়া হচ্ছে না তো। পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে কারো কাছ থেকে কোন অর্থ নেয়া হচ্ছে কি না, সুনির্দিষ্ট তথ্য জানুন। যে পরীক্ষাগুলো দেয়া হয়েছে, তা করতে খরচ আরও অনেক বেশি।’ তবে টাকার কোনো রশিদ দেয়া হচ্ছে না কেন? এমন প্রশ্নের কোনো জবাব বা উত্তর দেননি তিনি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ