খুলনা | শনিবার | ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ | ২২ মাঘ ১৪২৯

সম্পর্কের বন্ধনে পীড়ন বা স্ট্রেস ও শারীরিক ব্যধি

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী |
০১:৪৭ এ.এম | ০৪ জানুয়ারী ২০২৩


লোপা খানম (ছদ্ম নাম) বয়স ৩৬ বছর। তিনি একটি  প্রোথিতযশা বেসরকারি কোম্পানিতে ৯ বছর যাবৎ চাকুরি করেন। চাকুরিরত অবস্থায় তিনি স্বামী সংসারকে কেন্দ্র করে সুন্দর জীবন যাপন করছিলেন। স¤প্রতি তিনি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছেন, আর তিন মাস পর তার কোম্পানি বন্ধ হতে চলেছে। খবরটা জানতে পেরে তিনি এক প্রকার কঠিন পীড়নের সম্মুখীন হলেন  এবং ভাবতে শুরু করেছেন এখন তার উপায় কি। উলে­খ  কোম্পানি বন্ধ হওয়ার এ খবরটি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তার কোন প্রকার শারীরিক সমস্যা ছিল না। কিন্তু যখন তিনি কোম্পানি বন্ধ হওয়ার খবর  জানতে পারলেন-তখন হতে তার বিভিন্ন নেতিবাচক আবেগীয় মানসিক সমস্যা (যেমন-উদ্বিগ্নতা, পীড়ন,ভয় ও ক্রোধ) দেখা দিতে লাগলো।।এখন প্রায় তার রক্তচাপ উর্ধ্বমুখি থাকে। ডাক্তার বলেছেন পীড়নের কারণে তার রক্তচাপে গোলমাল দেখা দিয়েছে। তিনি এখন আর কোন কাজ মনোযোগ সহকারে করতে পারেন না। ইদানিং তিনি  ছোট খাট ব্যাপারকে কেন্দ্র করে প্রায় রাগ প্রকাশ করে থাকেন। বর্তমানে তার  রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চ মাত্রার ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রক ঔষধ খেতে হয়।   
নিনা খানম (ছদ্ম নাম) বয়স-৩৩ বছর। ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দ্ব›দ্ব এখন তাদের চরমে। ইদানিং নিনার পেটের পীড়ার বড় রকমের সমস্যা দেখা দিয়েছে। ডাক্তারের স্বরণাপণœ হওয়ার পর অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিনার কোন শারীরিক রোগ খুঁজে পেলান না। বরং ডাক্তার সাহেব শুধু এতটুকুই বললেন আপনার কোন মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া উচিৎ যিনি আপনার এ রোগের সমাধান দিতে পারবেন। ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক তিনি একজন মনোবিজ্ঞানীর স্মরণাপন্ন হলেন। মনোবিজ্ঞানী সাহেব তার আদ্যোপান্ত শ্রবন করে এবং কয়েকটি মনস্তাত্তি¡ক পরীক্ষা মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ণয় করলেন যে আসলে লীনা বর্তমানে এক প্রকার মানসিক চাপ তথা পীড়নমূলক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে যে কারণে তার পেটের পীড়া ও হাঁপানিসহ কতিপয় রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।  
উপরের ঘটনা দু’টি বিশ্লেষণ করলে-দেখা যায় যে ব্যক্তির পীড়নমূলক অবস্থা তার শারীরিক ও মানসিক সমস্যা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। গবেষণা দ¦ারা প্রমানিত হয়েছে যে পীড়নের প্রভাবে ক্যানসারের সদৃশ শারীরিক ব্যাধিও প্রভাবিত হয়। 
হ্যানস সেলী (১৯৩৬) নামে একজন চিকিৎসকের মতে, পীড়নের প্রতি ব্যক্তির যে জৈবিক বা শারীরিক প্রতিক্রিয়া ঘটে তা সাধারণ উপযোজন লক্ষণাবলী নামে প্রকাশ ঘটে। ব্যক্তি যখন দীর্ঘস্থায়ী  এবং কষ্টদায়ক পীড়নমূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় তখন প্রথম পর্যায়ে ব্যক্তির স্বয়ংক্রিয় স্নায়ু ব্যবস্থা সক্রিয় হয়, ২য় পর্যায়ে ব্যক্তির নানা প্রকার শারীরিক সমস্যা  যেমন-পাকস্থলির সমস্যা, রক্তচাপ বৃদ্ধি ইত্যাদির দ্বারা সে নিজেকে ঐরুপ পরিবেশ সাথে তথা পীড়নের সাথে অভিযোজন ঘটায়। ৩য় পর্যায়ে যদি পীড়ন তখনো বহাল থাকে, তখন শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে যায় এবং ব্যক্তির শারীরিক কোষ কলার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ব্যক্তি শারীরিক অবসন্ন হয়ে পড়ে এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
পীড়ন মোকাবেলার ক্ষমতা সকল ব্যক্তির সমান নয়। পীড়ন সাময়িক ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। পীড়ন দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যক্তির অভূতপূর্ব ক্ষতি সাধিত হয়। 
পীড়নের সাথে অসুস্থতার সম্পর্ক : (১) পীড়ন সবসময় সরাসরি স্বাস্থ্য ব্যাধি সৃষ্টি না করলেও  পরোক্ষ্য ভাবে স্বাস্থ্যবিষয়ক আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাধির কারণ হতে পারে। যেমন-তীব্র পীড়নের ফলে সিগারেটের মাধ্যমে ধূমপানের পৌন:পূণ্যতা বেড়ে যেতে পারে, নিদ্রার ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে, মদ্যপানের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। খাদ্যাভাসের পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে পীড়নের পরবর্তী এরূপ অব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আচরণ পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াতে সক্ষম। 
(২) দৈহিক দুর্বলতা তত্ত¡ : পীড়ন ও মনোশারীর বৃত্তিয় ব্যাধির মধ্যে যোগসূত্র হলো শারীরিক একটি জৈবিক প্রণালীর দুর্বলতা। এই তত্ত¡ অনুসারে পীড়নের সম্মুখীন হলে ব্যক্তির যে শারীরিক প্রণালীটি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল, সেই প্রণালীটি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন যার ফুসফুস জন্মগত ভাবে দুর্বল, পীড়ন হলে হয়তো তার হাঁপানি বেড়ে যেতে পারে। 
(৩) মনোসমীক্ষণ তত্ত¡ মতে : মনোসমীক্ষণ মনোবিদদের মতে, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে পীড়ন অবদমন করার জন্য বিশেষ বিশেষ মনোদৈহিক রোগ সমূহ সৃষ্টি হয়। যেমন-অবদমিত ক্রোধ ব্যক্তির মধ্যে আবেগীয় অবস্থা তৈরি করে যা মৌলিক রক্ত চাপ বৃদ্ধি করে। 
(৪) জ্ঞানীয় ও আচরণমূলক তত্ত¡ : ব্যক্তির মধ্যে নেতিবাচক আবেগ যেমন-অনুশোচনা,শোক, উদ্বেগ,ভবিষ্যৎ চিন্তা -এ গুলো স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুমন্ডলকে অনবরত উত্তেজিত রাখে। উত্তেজিত অবস্থা তীব্র হলে ব্যক্তির শরীরির প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় ফলে নানবিধ শারীরিক সমস্যা তখন দেখা দেয়।
পীড়ন সম্পর্কিত ধারণা ও শারীরিক ব্যাধি : পীড়নের মাত্রার উপর আরেকটি প্রভাব বিস্তারকারী শর্ত হলো সামাজিক সমর্থন ধারণা।পীড়ন মোকাবেলার ক্ষমতা সকল ব্যক্তির সমান নয়। ব্যক্তির জীবনে পীড়ন উপস্থিত হলেও যদি সামাজিক সমর্থন অটুট থাকে তবে পীড়ন মাত্রা হ্রাস পায়। ব্যক্তির আত্মীয় স্বজন,বন্ধু-বান্ধব বেশি থাকলে তারা পীড়নের সময় ব্যক্তি ভেঙ্গে পড়বে না কারণ সামাজিক সমর্থন তাকে পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করেতে উৎসাহ দেবে। ফলে পীড়নের ক্ষতিকারক ব্যাপকতা তুলনামূলক কম হবে। কার্যভিত্তিক সমর্থন ধারণা-হলো সামাজিক সম্পর্কের গুণগত বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্কগুলো কতটুকু ঘনিষ্ঠ বা ব্যক্তি বিশ^াস করে কিনা যে বিপদের সময় তার বন্ধু বা আত্মীয় স্বজন সাহায্য করবে। তার এরুপ বিশ^াসের উপর পীড়নের প্রভাব অনেকটা নির্ভর করে থাকে ।
পীড়ন ব্যবস্থাপনা : (১) উত্তেজনা হ্রাসকরণ : ব্যক্তিকে পেশির শ্লথন হ্রাসের শিক্ষা দেওয়া হয়। নিয়মিত শ্লথন অভ্যাস করলে ব্যক্তির পীড়ন মোকাবেলা ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। 
(২) আচরণমূলক কৌশল বা দক্ষতা শিক্ষণ : ব্যক্তিকে কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সময় ব্যবস্থাপনা শিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে ব্যক্তির পীড়ন মোকাবেলা ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। 
(৩) পরিবেশ ও সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তন : ব্যক্তির সামাজিক সমর্থন বৃদ্ধি করার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং সাথে সাথে পরিবেশ পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য সম্মত আচরণের জন্য উপযুক্ত ভাবে পরিবেশ পুনর্গঠন করা হয়। 
পীড়ন ক্রমে ক্রমে মানুষের মৃত্যু ঝুঁকিকে বাড়ায়ে তুলতে সক্ষম। তাই পীড়নকে মোকাবেলা ক্ষমতা বৃদ্ধি পীড়নের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচার অন্যতম সহায়ক পথ হিসেবে বিবেচিত। প্রয়োজনে একজন দক্ষ মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ গ্রহণ করে পীড়নকে মোকাবেলা করা সম্ভব। 
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা। ফ্রি পরামর্শ: ০১৭১৪৬১৬০০১

প্রিন্ট

আরও সংবাদ