খুলনা | শনিবার | ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ | ২২ মাঘ ১৪২৯

আসুন! ওষুধ ব্যতীত বিষণ্নতাকে ‘না ’ বলি

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, প্রফেশনাল সাইকোলজিস্ট |
০২:০১ এ.এম | ১৭ জানুয়ারী ২০২৩


ব্যক্তি মাত্র সুস্থ দেহ মনের প্রত্যাশী। কিন্তু  কখনো কখনো ব্যস্ত জীবনের কর্মধারা, পরিবেশ ও প্রতিবেশ আমাদের সুস্থ দেহ মনকে বিষিয়ে জীবনকে করে তুলছে ভারাক্রান্ত। তখন মনে ভর করে বিভিন্ন মানসিক সমস্যার বিষময়তা, ফলে জীবন হারায়ে ফেলে তার স্বাভাবিক ছন্দকে। মনের ছন্দ পতনের তথা জীবনকে বিষময় করতে অন্যতম দায়ী এমন এক মনস্তাত্তি¡ক বিষ হলো-বিষণ্নতা। 
গুরুতর বিষণ্নতার লক্ষণ সমূহ : সাধারণত
ব্যক্তি প্রায় প্রতিদিন বেশির ভাগ সময়ে দুঃখিত থাকে।
ব্যক্তির নিজের বাস্তব কাজকর্মের প্রতি আগ্রহ ও আনন্দহীনতা দেখা দেয়।
সহজে ব্যক্তির ঘুম আসে না, আর ঘুম এলেও মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম আসে না। কেউ কেউ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ে। আবার কখনো কখনো কারো করোর খুব ঘুম বেড়ে যায়।
ব্যক্তির সক্রিয়তার মাত্রায় পরিবর্তন ঘটে। হয়তো ব্যক্তি অলস হয়ে যায় নতুবা বেশি উত্তেজিত বা কর্মক্ষম হয়ে উঠে।
ব্যক্তির ক্ষুধা কমে যায় ও ওজন কমে যায় অথবা ক্ষুধা বেড়ে যায় ও ওজন বেড়ে যায়।
দিনের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ক্লান্তি বা অবসন্ন বোধ করে।
রোগীর মধ্যে নেতিবাচক আত্মধারণা বিকাশ ঘটে। নিজেকে দোষ দেওয়ার প্রবনতা তৈরি হয়, নিজেকে অপদার্থ মনে করার বদ অভ্যাস গড়ে ওঠে।
বেশির ভাগ কাজে ব্যক্তি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে।
ব্যক্তির মধ্যে পুনঃপূনঃ আত্মহত্যা চিন্তা অথবা মৃত্যু চিন্তা পেয়ে বসে।
ব্যক্তির মনোযোগ সমস্যা দেখা দেয়। সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবনতা তৈরি হয়।
ডিএসএম -৫ অনুযায়ী উপোরক্ত লক্ষণ সমূহের থেকে বক্তির মধ্যে পাঁচটি বা তার বেশি কমপক্ষে পনের দিন স্থায়ী হলে তাকে ব্যক্তির গুরুতর বিষণœতা হিসেবে অ্যাখ্যা দেওয়া হয়।
ওষুধ ব্যতীত বিষণ্নতা দূরীকরণে কতিপয় কৌশল:
মেজাজ প্রভাবক জীবন ধারার সাথে সংশ্লিষ্ট নিত্য রুটিনে কতিপয় অভ্যাস গ্রহণ করার মাধ্যমে : মানুষ যখন বিষণ্নতায় ভোগে, ওষুধ ব্যতীত তখন জীবন ধারার সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় ব্যবস্থাপনাকে পরিবর্তন সাধন করে বিষণ্নতাকে দূর করতে পারা যায়। জীবন ধারার সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনা সমূহ যেমন: সকালে ঘুম থেকে উঠে শারীরিক ব্যায়ামের অভ্যাস, ভোরের প্রকৃতিকে আনন্দের সাথে উপলব্ধি করা, মন দিয়ে শখের কাজ সমূহ করা, স্্রষ্টার নিকট চিঠি লেখা, খোলা আকাশের নিচে গিয়ে নীল মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকা ইত্যাদি প্রদক্ষেপ সমূহ মনকে ভালো করে যা বিষণ্নতা দূর করতে সহায়ক।
চিন্তার অভ্যাসের পরিবর্তে মনের ভিতর লুকায়িত কল্পনাকে লিখে প্রকাশ করা: জার্নালে লিখার অভ্যাস বিষণ্নতা দূরীকরণে বেশ কার্যকরী থেরাপি হিসেবে কাজ করে যা বিষণ্নতা হ্রাসে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত। ব্যক্তিগত জার্নালে নিজের অনুভূতি, চিন্তা ও উদ্বেগ সততার সাথে লিপিবদ্ধ করুন এবং বিষণ্নতাকে চ্যালেঞ্জল করুন। আপনি ভেবে অবাক হবেন যে প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েক মিনিট এক টুকরা কাগজে আপনার অনুভূতিকে লিপিবদ্ধের মাধ্যমে বিষণ্নতা হতে মুক্তির অন্যতম পথ খুজে পেতে পরম সহায়ক হতে পরে।
কাজের মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন: যাদের বিষণ্নতার অভিজ্ঞতা বিদ্যমান, তারা নিম্নমাত্রার আত্মমর্যাদাবোধ করে যে কারণে তার কোন কাজে আনন্দ না পাবার দরুণ সাধারন্ত সমাজ থেকে নিকেজে গুটিয়ে নিয়ে একাকি সময় কাটাতে বেশি স্বচ্ছান্দ্য বোধ করে। এ ক্ষেত্রে তাদের বন্ধুবৎসল হওয়া সময়ের দাবি। বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে নিজেকে নিয়োজিত করুন, তাদের হ্যালো করুন, এক সাথে ডিনার করুন, এক সাথে ঘুরতে বের হোন, এক সাথে হাঁটতে বের হোন, গল্পে এক সাথে মেতে উঠুন। মোট কথা ব্যস্তজীবনের মূল্যবান সময়কে কাজ ও আনন্দের সাথে অতিবাহিত করুন- তবে দেখবেন বিষণœতা কোন প্রকার ওষুধ ব্যতীত এমনিতেই দূর হয়ে গেছে।
আত্ম-ধারণাকে উন্নতি সাধনে আত্মনিয়োগ করুন: বিষণ্ন ব্যক্তিদের নিম্নমাত্রার আত্ম মর্যাদার অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তারা তাদের আত্ম ক্ষমতাকে সঠিক ভাবে প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়। সে কারণে আপনার ভিতর লুকায়িত বিদ্যমান সম্ভাবনাময় শক্তিকে ফোকাসকরণের মাধ্যমে ইতিবাচক চিন্তার অভ্যাসকরণ ব্যক্তির সম্ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলতে সহায়ক-যা বিষণ্নতা দূরকরণে পথ হিসেবে বিবেচিত।
রুটিন অনুযায়ী কাজ করুন: বিষণ্ন ব্যক্তিদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাজের আগ্রহতে নেতিবাচক প্রবনতার ধার প্রতীয়মান হয়। সময়োযোগী ও নিয়মমাফিক রুটিন ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজের অভ্যাস আপনার বিষণ্নতা হ্রাস করণে অন্যতম সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে।
স্বাস্থ্যসম্মত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন: রাত্রকানীন পর্যাপ্ত ঘুম ব্যক্তির সুন্দর মেজাজ বজায়ে রাখতে অন্যমত সহায়ক। বিষণ্ন ব্যক্তিরা ঘুমের ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় সমস্যায় ভুগে থাকে। যদিও অনেক সময় তারা বেশি সময় ব্যাপী ঘুমায় তথাপি তা অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ ঘুম  হিসেবে বিবেচিত। নিয়মিত কম পক্ষে সাত থেকে আট ঘন্টা দক্ষ ঘুমের সিডিউল বজায়ে রাখতে প্রাত্যহিক নির্দিষ্ট রুটিন অনুযায়ী বিছানায় ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন-যা বিষণ্নতা অনেকাংশে দূর করতে সহায়ক।
সুন্দর মেজাজ বাহক খাদভ্যাস গড়ে তুলুন: ব্যক্তির সুন্দর মেজাজ তথা সুন্দর জীবন যাপনে খাদ্য ও পুষ্টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। খাবারে যত দূর সম্ভব বিশুদ্ধ সাদা চিনি ও ভাজা জাতীয় খাবার, ক্যাফেইন বা সোড়া সমৃদ্ধ খাবার যতদূর সম্ভব খাবার তালিকা থেকে পরিত্যাগে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কারণ এরুপ খাবার আমাদের নার্ভাস সিস্টেমকে দুর্বল করে তুলতে সহায়ক। এর পরিবর্তে ওমেগা থ্রি সমৃদ্ধ খাবার- যেমন মলা, ঢেলা মাছ, জিং সমৃদ্ধ খাবার যেমন-কাঠ বাদাম, পটাসিয়াম সমৃদ্ধ যেমন-কলা, ভিটামিন সমৃদ্ধ যেমন-দুধ, ট্রিপটোফ্যান সমৃদ্ধ খাবার যেমন-মাছ ও মাংস  ব্রেনের সেরোটনিন ঘাটতিকে মোকাবেলা করে এবং ব্রেন ফ্যাংসনকে করতে ভূমিকা রেখে বিষণ্নতা দূরীকরণে অন্যতম সহায়ক হিসেবে বিবেচিত।
বিষণœতা মানুষের সকল সম্ভাবনার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শণ পূর্বক জীবনকে বিপর্যস্ত করে করে তোলে। মনে রাখবেন -বিষণ্নতা যতটা না শরীর কেন্দ্রীক, তার চেয়ে বেশি মানসিক।  আসুন ! আমরা নিজের সম্পর্কে আরো আত্ম বিশ্বাসী হয়, বিষণ্ণতাকে চির বিদায় জানায় এবং সুন্দর জীবন গড়ি।     
(লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা। বি সি এস (শিক্ষা) কর্মকর্তা।)

প্রিন্ট

আরও সংবাদ