খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৫ এপ্রিল ২০২৪ | ১১ বৈশাখ ১৪৩১

রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি ও শাবান মাসের আমল

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী |
১২:৩৯ এ.এম | ১১ মার্চ ২০২৩


আমাদের দেশে শবে বরাতকে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়। শবে বরাতের কোন রোজা আছে কিনা, নির্দিষ্ট কোন আমল আছে কিনা, শবে বরাতের রাতে নামাজ পড়া যাবে কিনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বেশ আলোচনা, সমালোচনা আর টকশো চলতে থাকে। কিন্তু যে বিষয়ে কারোও কোন দ্বিমত নেই, যা সহিহ হাদিস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত সেই বিষয়কে আমরা গুরুত্ব দিই না। যারা বলেন, শবে বরাতের রোজা নেই তাদের বেশির ভাগ লোককে দেখা যায়, শবে বরাত কে ঠেকাতে গিয়ে শাবানের রোজা যে আল­াহর রসূলের মজবুত একটি সুন্নত তাও ভুলে যান। ব্যাপারটা এমন হয় যে, শবে বরাতে কি কি করা যাবে না তাই নিয়েই আমাদের আলোচনা ঘুরপাক খেতে থাকে। শাবান হলো রমজানের পূর্ব প্রস্তুতির মাস। এই মাসে আল­াহর রসূল যে পরিমাণ রোজা রাখতেন, রমজান ছাড়া অন্য কোন মাসে এত বেশি রোজা রাখতেন না। শুধুমাত্র শেষের কয়েক দিন ছাড়া মহানবী (স.) প্রায় সারা শাবানই রোজা রাখতেন। 
শাবান মাসের গুরুত্ব:
আরবি এ মাসের পূর্ণ নাম হলো ‘আশ শাবানুল মুআজজম’ অর্থ- মহান শাবান মাস। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, রজব আল­াহ তায়ালার মাস, শাবান নবীজির মাস, রমজান হলো উম্মতের মাস। রজব মাসে ইবাদতের মাধ্যমে অন্তরের ভ‚মি কর্ষণ করা, শাবান মাসে আরো বেশি ইবাদতের মাধ্যমে সেই জমিতে বীজ বপণ করা, রমজান মাসে সর্বাধিক ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সফলতার ফসল ঘরে তোলা হয়। রমজান মাসের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসের নফল রোজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিহ হাদিসে আয়িশা (রাঃ) বলেন, রসূলুল­াহ (স.) কে আমি শাবান মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে এত অধিক নফল রোজা পালন করতে দেখিনি। তিনি যেন গোটা শাবান মাসই রোজা পালন করতেন। তিনি সামান্য (কয়টি দিন) ব্যতিত গোটা শাবান মাস রোজা রাখতেন (সহিহ মুসলিম)। মহানবী (স.)  এক ব্যক্তিকে বললেন, তুমি কি এ মাসের অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যেভাগে কিছু দিন রোজা রেখেছো? সে বলল, না। তিনি তাকে বললেন, রমজানের রোজা পালন শেষ করে তুমি এক দিন বা দুই দিন রোজা রাখবে (মুসলিম:২৬২৪)। আর এক হাদিসে এসেছে, আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল­াহ (স.) শাবান মাস ব্যতিত বছরের অন্য কোন মাসে এত অধিক রোজা পালন করতেন না। তিনি বলতেনঃ “তোমরা যথাসাধ্য অধিক পরিমাণে ভাল কাজ কর। কারণ আল­াহ তা’আলা সওয়াব দিতে কখনও ক্লান্ত হন না বরং তোমরাই আমল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়” (মুসলিম:২৫৯৪)। 
শাবান মাসের দোয়া:
রসূলুল­াহ (স.) রজব ও শাবান মাসব্যাপি এ দোয়া বেশি বেশি পড়তেন, ‘আল­াহুম্মা বারিক লানা ফি রজবা ওয়া শাবান, ওয়া বালি­গ না রমাদান’। অর্থাৎ- ‘হে আল­াহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন; রমজান আমাদের নসিব করুন।’ (মুসনাদে আহমাদ:২৫৯, বায়হাকি: ৩ :৩৭৫)
রমজানের প্রস্তুতি ও শাবানে করণীয়: 
১. শাবানে রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সে লক্ষে বেশি বেশি আমল করা নবীজির সুন্নত। 
২. শাবনে বেশি বেশি রোজা রাখা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
৩. শুধুমাত্র শাবানের শেষের কয়েকদিন রোজা ছেড়ে দেওয়া উত্তম যাতে তা রমজানের সাথে মিশে না যায়। 
৪. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে তাবেয়িন এবং প্রসিদ্ধ ইমামগণ শাবান মাস এলেই বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করতেন।
৫. বেশি বেশি দান সাদাকাহ করা যাতে রমজান জুড়েও তার ধারা অব্যাহত থাকে।  
৬. বেশি বেশি ইসতিগফার করা যা মানুষকে রমজান জুড়ে আমলে উদ্যোগী করে তোলে।
৭. রমজান মাসের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসের তারিখের হিসাব রাখা বিশেষ জরুরি একটি সুন্নাত আমল। হাদিস শরিফে নবীজি (স.) বলেন, ‘তোমরা রমজানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো।’ (সিলসিলাতুস সহিহাহ, আলবানি ২:১০৩) 
৮. রমজানের নতুন চাঁদ দেখা সুন্নাত। দেখতে না পারলেও তার দেখার জন্য চেষ্টা করা। 
৯. চাঁদ দেখে নতুন চাঁদের দোয়া পড়াও সুন্নাত। নতুন চাঁদ দেখে এই দোয়া পড়া, আল­াহুম্মা আহিল­াহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ঈমা-নি ওয়াছ ছালামাতি ওয়াল ইসলামি, রব্বী ওয়া রব্বুকাল­াহ; হিলা-লু রুশদি ওয়া খইর। অর্থঃ হে আল­াহ, এই চাঁদকে আমাদের ওপর উদিত কর নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে। হে চাঁদ তোমার ও আমার প্রভু একমাত্র আল­াহ (তিরমিজী)।
১০. রমজানের গুরুত্ব মানুষের মাঝে তুলে ধরা যাতে মানুষ তার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। রসূলুল­াহ শাবানের শেষের দিকে রমজানের ফজিলত তুলে ধরে সাহাবীদেরকে উৎসাহিত করতেন। 
গোটা শাবান মাসটাই বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ মাস। মহান আল­াহপাক আমাদের সবাইকে শাবান মাসে বেশি বেশি আমল করার তৌফিক দান করেন এবং রমজানের প্রস্তুতি দেয়ার তৌফিক দান করেন। 
(লেখক: মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, সিডনী থেকে)

প্রিন্ট