খুলনা | বুধবার | ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ২৮ মাঘ ১৪৩২

করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ৩)

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০২:৫৬ পি.এম | ১৪ জুন ২০২১

মানুষের জ্ঞানার্জনের ৩টি মাধ্যম রয়েছে ১. পঞ্চইন্দ্রিয়, ২. বিবেক, ৩. ইলমে অহী। পঞ্চইন্দ্রিয় ও বিবেক এই মাধ্যম দু’টির একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিধি আছে যার বাইরে তারা কোন কাজ করতে পারে না। কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু জ্ঞানার্জনের তৃতীয় মাধ্যমটি অর্থাৎ ইলমে অহী যেখানে পঞ্চইন্দ্রিয় ও বিবেক মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনে অক্ষম হয়ে যায় সেখানে মানুষকে পথ প্রদর্শন করে।
সায়েখুল ইসলাম আল্লামা মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম তাঁর ‘ইসলাম আওর হামারী যিন্দেগী’ তে লিখেছেন, জ্ঞান অর্জনের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত প্রথম মাধ্যম হচ্ছে পঞ্চইন্দ্রিয় তথা চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ইত্যাদি। চোখে দেখে মানুষ অনেক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। জিহ্বা দ্বারা স্বাদ গ্রহণ করে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। নাক দ্বারা শুঁকে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। হাত দ্বার স্পর্শ করে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। কিন্তু এই মাধ্যম গুলোর প্রতিটিরই একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিধি আছে, যার বাইরে তারা কোন কাজ করতে পারে না। চোখ দেখতে পারে কিন্তু শুনতে পারে না। কান শুনতে পারে কিন্তু দেখতে পারে না। নাক শুঁকতে পারে কিন্তু দেখতে পারে না।
আবার একটি নির্দিষ্ট স্তরে গিয়ে এই মাধ্যম গুলোর কর্মপরিধিও শেষ হয়ে যায়। তারপর না চোখ কাজে আসে, না নাক কাজে আসে, না কান কাজে আসে। এটি সেই স্তর, যেখানে বস্তু সরাসরি প্রত্যক্ষ দর্শনের আওতায় আসেনা। এ ক্ষেত্রে আল্লাহপাক আমাকে ও আপনাকে জ্ঞান অর্জনের অপর একটি মাধ্যম দান করেছেন। তা হল আকল বা বিবেক। যেখানে গিয়ে পঞ্চইন্দ্রিয় কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে সেখানে গিয়ে বিবেক সক্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন আমার সামনে একটি টেবিল রাখা আছে। আমি চোখের সাহায্যে বলতে পারব এটির রং কি। হাত দ্বার স্পর্শ করে বলতে পারব এটি শক্ত কাঠের তৈরী এবং এর উপর ফরমিকা বসানো আছে। কিন্তু টেবিলটি কিভাবে অস্তিত্ব লাভ করল? এ কথার উত্তর না আমি চোখ দ্বারা দেখে, না কান দ্বারা শুনে, না হাত দ্বারা স্পর্শ করে বলতে পারব। কারন এটির তৈরীর কাজ আমার চোখের সামনে হয়নি। এখানে আমার বিবেক দিকনির্দেশনা দিচ্ছে যে, এমন সুন্দর একটি টেবিল আপনা আপনি তৈরী হয়নি কোন দক্ষ কারিগর এটি তৈরী করেছে।
যেখানে আমার পঞ্চইন্দ্রিয় কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল, সেখানে আমার বিবেক কাজে এসেছে এবং দিকনির্দেশনা দিয়ে সে আমাকে অপর একটি জ্ঞান দান করেছে। কিন্তু যেভাবে পঞ্চইন্দ্রিয়ের কর্মপরিধি অসীম ছিল না, বরং একটি সীমানায় গিয়ে তার কর্মপরিধি শেষ হয়ে গিয়েছিল, অনুরুপ বিবেকের কর্মপরিধিও অসীম নয়। বিবেকও একটি সীমানা পর্যন্ত মানুষকে দিকনির্দেশনা দেয়। তাকে যদি সেই সীমানার বাইরে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সে সঠিক উত্তর দেবে না, সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করবে না।
জ্ঞানার্জনের তৃতীয় মাধ্যমটি হচ্ছে, ইলমে অহী। যেখানে পঞ্চইন্দ্রিয় ও বিবেক মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনে অক্ষম হয়ে যায় সেখানে মানুষকে পথ প্রদর্শন করে।
সিদ্দিকুর রহমান তাঁর ‘ঈমান বিল গায়েব’ কিতাবে লিখেছেন, একজন সাধারণ মানুষ খালি চোখে জড়জগতের যে টুকু দেখতে পায়, একজন বিজ্ঞানী দূরবিক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখতে পান তার থেকে অনেক বেশি। কিন্তু যিনি এইসব যন্ত্রের ধার ধারেন না, তাঁর দৃষ্টির পরিধি যন্ত্র ব্যবহারকারীর তুলনায় অনেক অনেক গুণ ক্ষুদ্র হবে তাতে আশ্চর্য কি?
ঠিক তেমনি ভাবে আল­াহর বিশেষ ব্যক্তিরা (নবী-রসূল) যা জানেন বা জানতে পারেন তা সাধারণ লোকের কল্পনা বহির্ভূত।
কোন কোন নবী-রসূলকে তাঁদের ক্ষমতানুযায়ী আল­াহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা তাঁর মাখলুকাতের (সৃষ্টিসমূহ) এবং মামলুকাতের (বিস্তৃত রাজ্যের) অনেক কিছু দেখিয়েছেন। হযরত ইদ্রিস আলাইহিসসাল্লামকে তিনি বেহেশত দর্শনের সুযোগ দিয়েছেন। সেখান থেকে তিনি আর ফিরে আসেন নি। হযরত ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ আলাইহিসসাল্লামকে তিনি নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের বিষয়সমূহ প্রত্যক্ষ করান। নবীশ্রেষ্ঠ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিশেষ বাহন-বোরাকের সাহায্যে আল্লাহ সাত আসমান ও বেহেশত-দোযখ পরিভ্রমণ করান। এমনকি আরশ মোআল্লায় আল্লাহ নিজেই তাঁকে দিদার (দর্শন) করান।
তিনি পয়গম্বরগণকে বিশেষ বিশেষ এলেম ও মোজেযা (অলৌকিকতা) দান করেছেন। হযরত দাউদ আলাইহিসসাল্লামকে পশু-পক্ষীর সাথে কথাবার্তা বলার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। হযরত খিজির আলাইহিসসাল্লামকে তিনি ইলম বা গুপ্তবার্তা দিয়েছেন- যা বুঝবার ক্ষমতা হযরত মূসা কালিমুল্লাহ আলাইহিসসাল্লামকে আল্লাহ দেননি। হযরত সোলায়মান আলাইহিসসাল্লাম জ্বীন সম্প্রদায়ের উপর হুকুমাত চালাতেন। তার তখত (সিংহাসন) বিনা ইঞ্জিনে হাওয়ায় চলত। হযরত ঈসা মসিহ আলাইহিসসাল্লাম আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করেছেন। আল্লাহ-হাকিম হযরত ইউসুফ আলাইহিসসাল্লামকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা এবং হযরত লোকমান আলাইহিসসাল্লামকে প্রকৌশল বিদ্যা (হিকমত) শিক্ষা দিয়েছিলেন। সাধারণ লোক এতদূর পৌঁছাতে পারে নি। তাই বলে এইসব অলৌকিক অস্তিত্বকে কেউ কি অস্বীকার করতে পেরেছে?
আমি কখনও এরোপ্লেনে ভ্রমণ করি না, তাই বলে কি রকেটে করে মহাশূন্য অভিযানকে অসম্ভব বলতে পারি? সাধারণের কাছে যা অলৌকিক বিশেষ লোকদের কাছে তা লৌকিক।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোন সীমা পরিসীমা নেই। মহা বিজ্ঞানী আল্লাহ যাকে যতদূর দান করেছেন, তিনি কতটুকুই জানেন, এর বাইরে নয়। একটি পিপীলিকার কাছে কয়েক বর্গফুট পরিমিত স্থান একটি দেশ বা মহাদেশ তুল্য। একটি পক্ষীর কাছে তার বিচরণ পরিসীমা কয়েক শত বর্গমাইল মাত্র। ‘এক গ্রাম কার্বণ ব্ল্যাক যখন এক গ্রাম ময়দার সঙ্গে মিশানো হয়, তখন আমাদের কাছে তা ধূসর বলে মনে হলেও ক্ষুদ্রতম রোগজীবাণু যখন হামাগুড়ি দিয়ে উপরে আসে, তখন তার কাছে এটা বিরাট কালো-সাদা প্রস্তর খণ্ডের স্তূপ বলে মনে হয়।’ --জন এ্যাডলক বুয়েহলার।
পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘তোমাদের সামান্য মাত্র জ্ঞানই দান করা হয়েছে’। কুরআন পাকের এই আয়াতের প্রতিধ্বনি করেই উনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক স্যার নিউটন বলেছেন, ‘আমি জ্ঞান সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে সবেমাত্র কয়েক উপল খণ্ড সংগ্রহ করেছি, জ্ঞানের অতল অথৈ সমুদ্র সামনে পড়ে আছে’। বাস্তবিকই হিসেব করলে মানুষ জ্ঞানের কি ই-বা জানে?
এই ক্ষুদ্রতি ক্ষুদ্র অনুজীব করোনার বিপরীতে সারা পৃথিবীর জ্ঞানীরা যখন নাকানি চুবানি খাচ্ছেন, তখন আমাদের পরিস্কার বুঝে আসে আসলেই আমাদের সামান্য মাত্র জ্ঞানই দান করা হয়েছে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা।

 

প্রিন্ট