খুলনা | শনিবার | ১৮ মে ২০২৪ | ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

‘মহুয়া আপুকে দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম সেদিন’

ইচ্ছা শক্তি-স্বামীর নিরব সমর্থনে সফল উদ্যোক্তা চট্টলার গৃহবধূ সুমনা ইসলাম রেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০২:০১ এ.এম | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩


সাফল্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। তাদের সফলতার গন্ডিও বাড়ছে। দেশের নারীরা সফলতার স্বপ্ন ছড়াচ্ছেন। ইচ্ছা শক্তি আর স্বামীর নিরব সমর্থন ও সন্তানের উৎসাহে একজন গৃহবধূ উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তার উজ্জল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন বরিশালের মেয়ে চট্টলার গৃহবধূ সুমনা ইসলাম রেবা। শিক্ষিত নারী, সন্তানের মা ও সংসারের গৃহিণী রেবা নিজের সঞ্চিত অর্থে তৈরি পোষাক ক্রয় আর অনলাইন প্লাটফর্মে পোষ্ট দিয়ে যে সফলতা অর্জন করেছেন তা আজ প্রশংসার দাবি রাখে। ‘আমরা নারী, তবু আমরাও পারি’ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে তারই দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন এ নারী উদ্যোক্তা। শৈশব কেটেছে বরিশালে বিয়ের পর চট্টগ্রামে স্বামীর সাথে সেই সূত্রে একযুগ কেটেছে গৃহবধূ ভূমিকায়। আর ঘরের কাজ সেরে মোটামুটি অবশিষ্ট সময়টুকু কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন রকম কাজ শিখতেন-ব্লক, বাটিকের কাজ, কুশি কাটার কাজ, টেইলারিং, হ্যান্ড প্রিন্ট, ইত্যাদি ইত্যাদি। 
ইচ্ছা শক্তি ও পরিবারের সহযোগিতা ও সমর্থন যেন কোন মানুষকে নতুন ভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামের পথচলায় প্রেরণা জুগিয়ে থাকে, তার প্রমাণ করেছেন গৃহিণী সুমনা ইসলাম রেবা। ছোটবেলা থেকে অভ্যাস ছিল যে কাজের পিছনে সময় ব্যয় করতেন সেটা করেই ছাড়তেন, যতক্ষণ না সাকসেসফুল হতেন। মার্কেট থেকে বা অনলাইন থেকে সাধারণ একটা ড্রেস নিলেও সেটা নিজ হাতে ডিজাইন করে বানাতেন রেবা।
এ নারী উদ্যোক্তা তার জীবনের গল্পে বললেন, মজার বিষয় হচ্ছে ড্রেসটা যখন আমি বানিয়ে পড়তাম, আমার আশেপাশের মানুষ ফ্যামিলির মানুষ সবাই বলতো ড্রেস টা-তো অনেক সুন্দর হয়েছে, কোথা থেকে নিয়েছো?  ছোটবেলা থেকেই আমি একটু ফ্যাশন প্রিয় ছিলাম, নিজেকে একটু পরিপাটি করে রাকতাম।
উদ্যোক্তা হওয়ার পিছনে গল্প যেখানে শুরু : টুকটাক কাজের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে আমার বিয়ের ১২টা বছর, ছেলে-মেয়ে সংসার নিয়েই হঠাৎ মাথায় আসলো যে আমি কিছু একটা করবো। বাট কি করবো কিভাবে করব সেটা ভাবতে ভাবতে চলে গেল ৬ মাস.... আমি চেয়েছিলাম মূলত এমন একটা প্রফেশন বেছে নিতে, যেটা আবদার করলে আমার হাজব্যান্ড (স্বামী) যেন না বলতে না পারে.....এগুলো চিন্তা করতে করতে একদিন আমি ফেসবুক টাইমলাইন দেখতে ছিলাম, হঠাৎ আমার সামনে আসলো উই গ্র“পের একটা পোস্ট... উই’র সাথে অবশ্য আমি যুক্ত ছিলাম ২০১৯ সাল থেকে... মাঝে মাঝে উই-য়ের উদ্যোক্তাদের থেকে টুকিটাকি কেনাকাটাও করতাম... আর সেই পোস্টটা ছিল আমাদের উই’র একজন উদ্যোক্তার (মরহুমা) মহুয়া আপুর ওনার পোষ্টের সাথে যে স্টোরি টা ছিল, ওটা আমি পড়লাম। তখনই চিন্তা করলাম মহুয়া আপু যদি কিছু করতে পারেন, তাহলে আমি একটা সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে হয়ে কেন কিছু করতে পারবো না! সেদিনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম আমিও অনলাইনে কিছু একটা করব। আর মহুয়া আপুকে দেখেই আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি...মহুয়া আপু আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেই, তবে মহুয়ারা কখনো মরে না। তারা বেঁচে আছেন হাজারো উদ্যোক্তার অনুপ্রেরণা হয়ে!
মহুয়া আপুর পোস্টটা যেদিন আমার সামনে পড়েছিল সেদিন ছিল ২০২১ সালের ফেব্র“য়ারি মাসের ৯ তারিখ... সেদিন রাতে আমার হাজব্যান্ড (স্বামী) যখন অফিস থেকে বাসায় আসেন, আমি ওর সাথে শেয়ার করি কিছু একটা করতে চাই...ও শুনে একটু অবাক হয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, এরপর বললো আচ্ছা ঠিক আছে কি করতে চাও শুনি। 
আমি বললাম যে আমি ঘরে বসেই অনলাইনে কিছু একটা নিয়ে কাজ করতে চাই। 
ও বলল সেই কিছুটা কি?... কি নিয়ে কাজ করতে চাও? 
তখন আমি ওকে উল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম, আচ্ছা তোমার কি মনে হয় আমার ফ্যাশন সেঞ্জ কেমন?  বা আমি যে ড্রেসগুলো কিনে পড়ি সেগুলো চয়েজে আমার রুচিবোধ কেমন তুমি কি মনে করো? আমার চয়েজ ভালো না খারাপ? ও বললো খারাপ না ভালই তো। 
তখন আমি বললাম, তাহলে আমি ড্রেস নিয়েই কাজ করবো। তোমাকে এখনই হা বা না কিছুই বলতে হবেনা, তুমি একটু চিন্তা-ভাবনা করে আমাকে আগামীকালকে বলবে। তুমি যদি সম্মতি দাও তবেই আমি কাজটা শুরু করবো। 
এরপর পরের দিন যখন ও অফিস থেকে বাসায় ফিরলো তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম  তোমার সিদ্ধান্ত কি?
আমাকে বল। 
ও আমাকে বলল তুমি কি আসলেই সিরিয়াস? 
আমি বললাম হা অফকোর্স।
এরপরে ও বলল ওকে এখন আমাকে কি করতে হবে বলো? 
আমি ওকে হেসে বললাম যে তুমি এখন শুধু চেয়ে চেয়ে দেখো ।
আমার ব্যাস প্রয়োজন ছিল তোমার সম্মতির...সেটা আমি পেয়ে গেছি, বাকিটা আমি নিজেই এ্যারেঞ্জমেন্ট করে নিব ইনশাআল­াহ। 
চূড়ান্ত সেই দিনটা ছিল ২০২১ সালের ফেব্র“য়ারির মাসের ২১ তারিখ। প্রথমে আমি উই গ্র“পে আমার পরিচিতি পোস্ট করলাম। খুব ভয়ে ভয়ে কি লিখবো কি লিখবো? করে করেই ফেললাম পরিচিতি পোস্ট। 
হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম ব্যবসা করবো অনলাইনে। তারপরের দিন চলে গেলাম চট্টগ্রাম টেরিবাজারে সাথে নিয়ে গেলাম জমানো ৮৭ হাজার টাকা। আর সেই বাস্তবায়নে প্রথম দিনে ৫২,০০০ টাকার কাপড় কিনে নিয়ে বাসায় ফেরলাম মা-ছেলে। 
নারী উদ্যোক্তা রেবা তার সাফল্যের গল্প বলতে যেয়ে বলেন, কাপড় কিনে নিয়ে সেদিন বাসায় আসতে প্রায় সন্ধ্যা হয়েছিল, খুব ক্লান্তও লাগছিল.... তারপরও অনেক এক্সাইটেড ছিলাম, একটু রেস্ট (বিশ্রাম) নিয়ে শুরু করলাম কিনে আনা ড্রেসের ছবি তোলা। আর ছবি তুলতে যেয়ে কখন যেন রাত পৌনে ১টা বেজেছে তা ছিলনা স্মরণে। ক্লান্ত দেহে সেই রাতেই উই-তে করলাম প্রথম সেল পোস্ট। এভাবে পাঁচদিনে পাঁচটা পোস্ট করলাম। সেই সাথে অন্য আপুদের পোস্ট পড়ার পাশাপাশি লাইক কমেন্টও করলাম। 
তার সফলতার গল্পে নারী উদ্যোক্তা আরও বলেন অনলাইনে কন্টিনিউ ৫নং পোস্ট থেকে প্রথম অর্ডার আসলো দু’টি বাটিক ড্রেসের। ক্রেতাও ছিল চমৎকার, ২,০৫০ টাকা অগ্রিম বিকাশ করে দিলেন,, ড্রেসের দাম ছিল ১,৯০০ আর ডেলিভারি চার্জ ১৫০ টাকা। সেদিনের খুশি আসলে ভাষায় বয়ান করার মতো ছিলনা রেবার। দু’টি ড্রেসে প্রফিট ছিল মাত্র ৩০০ টাকা.... কিন্তু ওই ৩০০ টাকাটা সেদিন আমার কাছে তিন লাখ টাকার মত।
রেবা আক্তার তার নারী উদ্যোক্তার কথা বলতে যেয়ে বলেন লাগাতার ৭-৮ মাস উই-তে একটানা কাজ করে যাচ্ছিলাম, আর ভালই রেসপন্সও পেয়েছি....মাঝে কিছুটা টুকিটাকি ঝামেলা হয়েছে তবুও আমি তার সমাধান নিজেই খুঁজে নিয়েছিলাম। 
সফল এ নারী উদ্যোক্তা বলেন হঠাৎ একদিন আমার স্বামী কোন একটা কারণবশত চাকুরি থেকে ইস্তফা নিলেন।  তবে সাথে সাথে অন্য অন্য জায়গায় আবার সিভিও (জীবন বৃত্তান্ত) জমা দিয়ে দিলেন। তখন আমি বললাম তুমি তোমার জবটা (চাকুরি) একটু কিছুদিন পরে করতে পারবে না, কেননা আমি মার্কেটপ্লেসে একটা শো-রুম নিতে চাই। আর তুমি আমার শো-রুমটা গুছিয়ে দিয়ে তবেই আবার নতুন জবে (চাকুরি) জয়েন করবে। ও (স্বামী) সম্মতি দিয়ে দিলেন, এরপর তিনদিনের মধ্যে মার্কেটেও শো-রুমও নিলাম,, শুরু হলো শো-রুমের ডেকোরেশনের কাজ। আর এরই মধ্যে ওর (স্বামী) জবের (চাকুরি) জন্য ডাক আসলো পাবনার রূপপুর থেকে। 
রেবা তার নিজ গল্পে বললেন এটা খুশির সংবাদ হলেও সেদিন আমার মাথায় পড়লো হাত, আমি একা-একা কি করব। মনে মনে ভাবতে ছিলাম,, বাট ভেঙে পড়িনি, ওকে (স্বামী) সেটা বুঝতেও দেইনি, এরপরও আমাকে জিজ্ঞাসা করল, আমি এখন কি করবো, আমি কি জবটা (চাকুরি) জয়েন (যোগদান) করবো? 
হাজারো কষ্ট বুকে চেপে ধরে তখন আমিও সাহস করে বলে ফেললাম অবশ্যই এরকম ভালো পজিশনের জবতো তুমি সবসময় এভাবে পাবে না, তুমি জয়েন করো আমি এদিকে সামলে নিব... ও আসলে খুব চিন্তিতও ছিল। সন্তান ও সংসার সামলিয়ে কি পারবে। আমি একা একটা মেয়ে মানুষ, ছেলে-মেয়ে সংসার সবকিছু কিভাবে ম্যানেজ করবে একা-একা। তারপরও আমার সাহস দেখে ও (স্বামী) চলে গেলেন পাবনায়, মহান আল­াহর-তালার অশেষ রহমতে যেদিন ইন্টারভিউ দিল আর সেদিনই বললো আজকে থেকেই আমাকে জয়েন (যোগদান) করতে হবে। ও (স্বামী) ভেবেছিল ইন্টারভিউ দিয়ে চলে আসবে আমাকে হেল্প করতে। আমাকে ফোন দিয়ে বলল, আমি এখন কি করবো ওনারা তো বলছে, আমাকে আজকে থেকেই কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে....। আমি বললাম ঠিক আছে, তাহলে তুমি জয়েন কর...এদিক নিয়ে তুমি একদমই চিন্তা করোনা, আমি সবকিছু ম্যানেজ করতে পারবো ইনশাআল­াহ।  
নারী উদ্যোক্তা রেবার আত্মবিশ্বাস যেন তার পথচলাকে আরও সুন্দর করে দিল। ইতোমধ্যে চলে গেল একমাস, স্বপ্নের শো-রুম ডেকোরেশন করতে! আর ডেকোরেশন শেষ হওয়ার পর ফোন দিলাম আমার সন্তানের বাবাকে। আর বললাম শোরুমের জন্য প্রোডাক্ট কিনতে হবে, আমি ঢাকায় আসছি, তুমি দু’দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় চলে আসতে পারবে কিনা। 
গৃহবধূ থেকে সফল এ উদ্যোক্তা দৃঢ়তার সাথে নতুন ভাবে নেমে পড়লেন জীবন সংগ্রামে। গুগলে সার্চ দিয়ে জেনে নিলেন দেশের সব থেকে বড় বৃহত্তম পাইকারি মার্কেট কোথায়, তার লোকেশনও বা কোথায়। যেই কথা সেই কাজ চলে আসলেন ঢাকায়,  ওই-দিগ থেকে ও (স্বামী) অসলো। এরপর দুজন দু-দিক থেকে একত্রিত হলাম ঢাকা নিউমার্কেট এলাকায়। প্রথমে একটা হোটেল বুকিং করলাম ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম কেনাকাটা করতে, এরপর টানা তিনদিন যাবত কেনাকাটা করলাম, ঘুরলাম ঢাকার যত পাইকারি মার্কেট আছে, তার অলিতে-গলিতে কেনাকাটা করে সব প্রোডাক্ট কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানো হলো চট্টগ্রামে। নিজ এলাকায় ফিরে পার্সেল রিসিভ করে নিয়ে আসা হলো শোরুমে। নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পণ্য তোলা হচ্ছে, সেদিনের সেই আনন্দ কারো সাথে ভাগাভাগি করা মত ছিল না।  শুরু করলাম শো-রুম সাজানো ইতোমধ্যে দু’জন সেলসম্যানও নেওয়া হলো।
নারী উদ্যোক্তা রেবা বললেন শো-রুম গুছানো শেষে আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ওপেনিং ডে, খুব ছোট্ট পরিসরে আমন্ত্রিত হলেন পরিবার-পরিজন। হাজবেন্ডও (স্বামী) আসলো। শুরু হলো আমার নতুন পথযাত্রা। আর এভাবেই আমার উদ্যোক্তার হওয়ার জীবন গল্প শুরু হলো। 
সুমনা ইসলাম বলেন, নিজেকে পরিপূর্ণ উদ্যোক্তা বলার সাহস এখনো হয়ে ওঠেনি, সেটুকু যোগ্য আমি নিজেকে এখনো মনে করি না, আল­াহ পাক রব্বুল আলামীন যদি চান তাহলে আমি হয়তো একদিন বলতে পারব আমিও একজন সফল উদ্যোক্তা।  
সফল নারী উদ্যোক্তা সুমনা ইসলাম রেবা আল­াহর রহমত আর সকলের দোয়ায় ইনশাআল­াহ একদিন সফল হবেন এই আশায় বুক বেধে চলছেন আগামী দিনের পথচলায়। সেই সাথে শুকরিয়া জানান, উই পরিবার এবং তার জননী নাসিমা আক্তার নিশাকে, যিনি দিয়েছেন, আমাদের মত নারী উদ্যোক্তাদের ঘরে বসেই স্বাবলম্বী হওয়ার মতো সুন্দর একটা প্লাটফর্ম।
তিন সন্তানের জননী সুমনা ইসলাম রেবা। একদিকে তিন সন্তানের দেখাশোনা, অন্যদিকে পরিবার ও ব্যবসার দায়িত্ব-সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে ঠিকই সামলে নিয়েছেন তিনি। একজন নারী হিসাবে তার মতে নারী উদ্যোক্তা হওয়ার মূলমন্ত্র হলো-পরিশ্রম আর সততা; এ দুই গুণই একজন নারী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করেন তিনি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ