খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৫ এপ্রিল ২০২৪ | ১১ বৈশাখ ১৪৩১

দুই শতাধিক ডেঙ্গুরোগী খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন : সরকারি হাসপাতালে ওষুধ সংকট বাইরে দাম তিনগুণ : সনাতনী কায়দায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সুফল নেই

খুলনায় ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম

বশির হোসেন |
০২:২২ এ.এম | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩


ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে খুলনার ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থা। শনিবার দুপুর পর্যন্ত খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছেন দুই শতাধিক রোগী। ডেঙ্গু চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নরমাল স্যালাইন ও গ্লুকোজ স্যালাইন সংকট দেখা দিয়েছে খুলনার সরকারি হাসপাতালে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেড় শতাধিক রোগী থাকলেও নরমাল স্যালাইন ইতোমধ্যে শেষ। বেশির ভাগ ওষুধ রোগীদের কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। সংকটের দোহাই দিয়ে ডেঙ্গু চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্যালাইন ও ওষুধ বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেশি দামে। আর সনাতনী কায়দায় সিটি কর্পোরেশনের ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কোন সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। ফলে দিন দিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এখনি এর লাগাম না টানতে পারলে পরিস্থিতি মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। 
দুই শতাধিক ডেঙ্গুরোগী খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে : শনিবার দুুপুর পর্যন্ত খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে দুই শতাধিক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট সয্যা সংখ্যা ৫শ’ হলেও এখানে শুধু ডেঙ্গু রোগী আছে দেড় শতাধিক আর মোট রোগী ১৬শ’ ৮৭ জন যা ধারণ ক্ষমতার তিনগুণেরও বেশি। 
সরেজমিন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা যায় হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডের বাইরে বিভিন্ন ওয়ার্ডের একটা বড় অংশ জুড়ে ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। মশারী টানানোসহ কোন নিয়মনীতি মানা হচ্ছে না এসব ওয়ার্ডে ফলে এখান থেকে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া খুলনা সদর হাসপাতালে ৩৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন এছাড়া খুলনার তিনটি বড় বেসরকারি হাসপাতালে আছে আরও ১৭জন ডেঙ্গু রোগী। গত ২৪ ঘন্টায় খুলনায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে অর্ধশতাধিক রোগী। 
সরকারি হাসপাতালে ওষুধ সংকট বাইরে দাম তিনগুণ : সরেজমিন খুমেক হাসপাতালে কয়েকজন রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, রোগীদের বেশিরভাগ ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় সব থেকে বেশি ব্যবহৃত নরমাল স্যালাইন শেষ হাসপাতালের স্টক থেকে। 
স্টোর থেকে পাওয়া তথ্য মতে গত ১৫ জুন ৫শ’ এমএল-এর ১৫শ’ পিস স্যালাইন আসছে ইডিসিএল থেকে। এরপর স্যালাইন শেষ হওয়ার পর শনিবার ও হাসপাতালের সংকটের কথা উলে­খ করে ইডিসিএল এর কাছে চিঠি লিখেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর আগে ৪ ফেব্র“য়ারি ৩ হাজার পিস স্যালাইন এসেছিলো এই হাসপাতালে। এছাড়া গ্লুকোজ স্যালাইনের দীর্ঘ সংকটের পর ১৮শ’ স্যালাইন এসেছে যা দিয়ে বর্তমান অবস্থায় ১০ দিনের বেশি চালানো সম্ভব না। 
এদিকে খুলনায় বিভিন্ন ফার্মেসীতে ঘুরে নরমাল স্যালাইন (ডিএনএস ) স্যালাইন পাওয়া যায়নি। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনেসহ বেশ কয়েকটি ফার্মেসীর সাথে কথা বলে জানা যায় স্যালাইন সংকট রয়েছে বাজারে। তবে রোগীরা অভিযোগ করেছেন ৮০ টাকার স্যালাইন ৩শ’ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে তাদের নুসরাত জাহান নামে নগরীর গল­ামারী এলাকা থেকে আসা এক রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায় ৬ দিন ধরে খুমেক হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সকাল বিকাল চিকিৎসক এসে খোজ নিলেও নাপা আর গ্যাসের ওষুধ ছাড়া সব ওষুধ কিনতে হয়েছে বাইরে থেকে। আর বাইরে দ্বিগুন ও তিনগুন দাম প্রত্যেকটি ওষুধের। একই ধরণের অভিযোগ জানিয়েছেন, দ্বিতীয় তলার সোবাহান (৫৫), সোহাগ (৩৩), সালমা(২৪)। তারা বাইরে থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনতে কিনতে সর্বশান্ত হচ্ছে। 
খুমেক হাসপাতালের ডেঙ্গু ফোকাল পারসন ডাঃ সুহাস রঞ্জন হালদার বলেন, ৫শ’ বেডের জন্য নির্ধারিত ওষুধ দিয়ে ১৭শ’ রোগীর চিকিৎসা করতে গেলে সব সময় সবাই সমান ভাবে পায় না। আবার দেখা গেলো কোন রোগী আজকে ভর্তি হয়েছে সে হয়তো সিস্টারদের ওষুধ এর খাতায় এখনও ওঠেননি তাই ঐ দিন তিনি ফ্রি ওষুধ পাননি। তবে ডাঃ সুহাস এর কথা যে শুধু কথার কথা তা ওয়ার্ডে প্রত্যেকটি রোগী এমনকি হাসপাতালের স্টোরে কথা বলে জানা গেছে। স্টোর কিপার মানস মজুমদার বলেন এই মুহূর্তে হাসপাতালে কোন নরমাল স্যালাইন সাপ্লাই নাই যেটা ডেঙ্গু রোগীদের সব থেকে বেশি প্রয়োজন। 
সনাতনী কায়দায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সুফল নেই : এদিকে খুলনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে ফগার মেশিন নির্ভরতায় কোন কার্যকর সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। আর কার্যকর কোন উদ্যোগ। মশক নিধন কার্যক্রম চলছে পুরাতন মডেলে, নেওয়া হয়নি এডিসের লার্ভা শনাক্তের উদ্যোগ।  
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিটি কর্পোরেশনে কীটতত্ত¡বিদের কোনো পদ নেই। আর লার্ভা শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবও নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সরকারের রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সহায়তায় লার্ভা জরিপ হয়। কিন্তু কেসিসির পক্ষ থেকে এই দু’টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি। ফলে নগরীতে কোনো এলাকায় এডিসের লার্ভা কী পরিমাণ রয়েছে-তা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই সংস্থাটির কর্মকর্তাদের। সনাতনী কায়দায পুরাতন রুটিন ধরেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম চলছে সিটি কর্পোরেশনের।
অবশ্য কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোঃ আনিসুর রহমান দাবি করেন, মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। প্রতিদিনই নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে লাইট ডিজেল ও কালো তেল স্পে করে মশার লার্ভা নিধন করা হচ্ছে। বিকালে ফগার মেশিন দিয়ে বড় মশা নিধনের কাজ চলছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ভাবেও বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন কাজ চলছে।
তিনি বলেন, নিজের বাড়ির আঙিনা, ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করতে নগরীতে মাইকিং করা হচ্ছে। মশক নিধনের পাশাপাশি কেসিসির ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিভিন্ন ওয়ার্ডে অভিযান চলছে। বেশ কয়েকটি বাড়িতে জরিমানাও করা হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ