খুলনা | সোমবার | ১৭ জুন ২০২৪ | ৩ আষাঢ় ১৪৩১

আত্মীয়-স্বজনের প্রতি করণীয়

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:১৮ এ.এম | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩


আত্মার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে আত্মীয় বলা হয়। সাধারণত বংশীয় এবং বৈবাহিক সূত্র থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। যে সব নিকটতম ব্যক্তি যারা আমাদের বংশীয় সম্পর্কের দ্বারা আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ যেমন ভাই-বোন, চাচা-মামা, খালা-ফুফু, তাদের ছেলে মেয়ে এবং বৈবাহিক সম্পর্কের দ্বারা শ্বশুর বাড়ীর লোকজন, ছাড়াও অন্য লোক যারা আত্মীয়তা সূত্রে আমাদের সাথে সংশ্লিষ্ট। শরয়ী বিধান অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজনের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা হক বা অধিকার রয়েছে। তাদের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব। শরয়ী কারণ ছাড়া সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্পূর্ণ হারাম।
আত্মীয়-স্বজনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কিত ইসলামে যে নির্দেশনা রয়েছে তা সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করব, ইনশাল্লাহ্।
১. বড়দের যথাযথ শ্রদ্ধা, সম্মান ও মর্যাদা দেয়া ও ছোটদের স্নেহ করা: আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে ভাই-বোনের অধিকার সবচেয়ে বেশি। কেননা সম্পর্কের দিক দিয়ে তারাই একে অপরের নিকটতর। ভাই-বোনের মধ্যে যে যত বড়, তাকে তত শ্রদ্ধা-ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শন করা জরুরি। এছাড়া বড়রাও ছোটদের স্নেহ করবে।
২. উত্তম আচরণ করা: পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করো, আর উত্তম আচরণ করো নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে।’ (সূরা নিসা: ৩৬)
৩. উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা: উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের সঠিক ভাগ বন্টন করা। সকলের নিজ নিজ হিস্যাকে পরিপূর্ণ রূপে দিয়ে দেওয়া। কুক্ষিগত করে না রাখা।  বর্তমানে আমাদের সমাজে একটি বিষয় মহামারীর আকার ধারণ করেছে তা হলো নিজের বোনদের হক না দেওয়া। অর্থাৎ পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের রেখে যাওয়া সম্পদের সঠিক ভাগ বন্টন না করা। অনেকেই মনে করে থাকে পিতা-মাতা বোনেদের বিয়ের সময় অনেক খরচ করেছেন, জমি-জায়গা বিক্রি করেছেন এখন আবার তারা সম্পদের ভাগ কী পাবে? অভিজ্ঞতায় অনেক দ্বীনমুখী মানুষের মধ্যেও এ প্রবণতাটি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু খুব সাবধান এমটি হলে মহান আল্লাহ কঠিন আজাবে গ্রেফতার করবেন।
৪. নিয়মিত সাক্ষাৎ করা: আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার জন্য অবশ্য করণীয় হচ্ছে তাদের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ করা। ৫. নিয়মিত খোঁজ-খবর নেওয়া।
৬. খুব সালামের প্রচলন করা: এক হাদীসে আছে শুধু সালামের মাধ্যমে হলেও তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর (মাযমাউয যাওয়য়েদ)
৭. তারা বাড়ীতে আসলে তাদেরকে সানন্দে গ্রহণ করা ও যথাসাধ্য আপ্যায়ন করা। ৮. মাঝেমধ্যে বাড়ীতে আমন্ত্রণ করা। ৯. দাওয়াত দিলে তাদের দাওয়াত কবুল করা।
১০. হাদিয়া দেওয়া: পারস্পরিক হৃদ্যতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে একে অপরকে হাদিয়া প্রদান। এজন্য আত্মীয়তার সম্পর্ক  উন্নয়নের জন্য তাদের হাদিয়া দেওয়া এবং তারা হাদিয়া দিলে তা সানন্দে গ্রহণ করে নিজের খুশি প্রকাশ করা। ১১. তাদের সুসংবাদে শরীক হওয়া।
১২. বিপদাপদে সহযোগিতা করা পাশে দাঁড়ান, সহমর্মিতা প্রকাশ করা ও সমব্যথী হওয়া, প্রয়োজনে সান্তনা দেওয়া।
১৩. তাদের কোন অভিযোগ থাকলে তা শোনা ও দূর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা।
১৪. বিবাদমান বিষয় দ্রুত মীমাংশা করা এবং সম্পর্কোন্নয়ন ও মজবুত করণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখা। ১৫. অভাবগ্রস্ত হলে সহযোগিতা করা।
১৬.দান পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের গরীব আত্মীয়-স্বজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া: আমরা অনেকেই নিকটাত্মীয়দের দান করার পরিবর্তে অন্যকে দান করতে অধিক পছন্দ বোধ করি। আবার অনেকেই নিকটাত্মীয়দের কষ্টদায়ক আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে দান-খয়রাত, সাহায্য-সহযোগিতা সবকিছু অন্যদের করে থাকে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো দান-খয়রাত করতে হবে আগে নিজের নিকটাত্মীয়দের। যে যত বেশি কাছের, যে যত বেশি আপন সে দান পাওয়ার ততো বেশি হকদার।
১৭. তাদের হেদায়াতের চেষ্টা করা: আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, তাদের হেদায়াতের চেষ্টা করা, সঠিক পথের দিকে তাদেরকে দাওয়াত দেওয়া। সেই সাথে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেওয়া ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। যাঁরা রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচাইতে কাছের, সব চাইতে ঘনিষ্ঠ এবং সব চাইতে নির্ভরযোগ্য ছিলেন সর্বপ্রথম তিনি তাঁদেরই নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছিলেন। এ দলের মধ্যে ছিলেন পরিবারের লোকজন, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব।
১৮. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করা: নিকটাত্মীয়দের পক্ষ থেকে অসদাচরণ, অসম্মান, বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ পেয়ে অথবা তাদের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আমরা অনেকেই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিই। আমরা একটা কথা প্রায়ই বলে থাকি, আমার অমুক আত্মীয় আমার সাথে ভাল ব্যবহার করে না, আমার ভাল চায় না, অতএব আমিও তার সাথে ভাল ব্যবহার করব না, তার খোঁজখবর রাখব না বা তাকে সাহায্য সহযোগিতা করব না। মনে রাখতে হবে, এরকম বলা বা এরকমটা করা মারাত্মক ভ্রান্তি এবং গোনাহ ।
রসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সমপরিমাণ বিনিময় আদায়কারী আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী নয় ; বরং প্রকৃতপক্ষে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী হল সে, যে আত্মীয়তার সম্পর্ক তার সঙ্গে ছিন্ন করার পরও সে বন্ধন ছিন্ন করে না। (বুখারী)
১৯. অসুস্থ হলে সেবা করা: আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ অসুস্থ হ’লে তাকে দেখতে যাওয়া এবং সাধ্যমত তার সেবা-শুশ্রƒষা করা।
২০. জানাযায় শরীক হওয়া: আত্মীয়দের কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার জানাযায় শরীক হওয়া। ২১. তাদের নিরাপত্তা, সংশোধন, হেদায়াত ও মাগফিরাতের জন্য দো’আ করা।
২২. হযরতে ওলামায়ে কেরামগণ বলেছেন, ইসলাম ন্যায়-অন্যায় উপেক্ষা করে অন্ধভাবে সমর্থন বা বিরোধীতার পক্ষপাতি নয়। ন্যায় ও ইনসাফের দৃষ্টিতে ইসলাম বংশ, গোত্র, ভাষা, বর্ণ, ধর্ম, দেশ, জাতি সকল কিছুর উর্দ্ধে। একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্য ইসলাম আত্মীয়তার দাবিকে খুবই গুরুত্ব প্রদান করে। যদি কোন আত্মীয়ের মধ্যে অহংকার, আত্মগৌরব, শত্র“তা ও বিরোধীভাব পরিলক্ষিত হয় অথবা কেউ যদি এই আশঙ্কা করে যে, তার কোন আত্মীয় তাকে প্রত্যাখ্যান করবে ও তার সাথে বাড়াবাড়ি করবে, তাহলে তার সাথে নম্রতা অবলম্বন করা অথবা তাদের থেকে এমনভাবে দূরত্ব বজায় রাখা যে, সেটা যেন তাদের কোন কষ্টের কারণ না হয়।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আত্মীয়-স্বজনের যথার্থ কল্যাণ কামনার মাধ্যমে আমাদের তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করার তৌফিক দান করুন, অমিন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। 
সংকলক : লেখক ও গবেষক।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ