খুলনা | সোমবার | ১৭ জুন ২০২৪ | ৩ আষাঢ় ১৪৩১

হাদিসের দৃষ্টিতে আখেরি চাহার শোম্বা

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী |
০২:০৫ এ.এম | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩


‘আখেরি চাহার শোম্বা’ অর্থ হলো ‘শেষ বুধবার’। উদ্দেশ্য হলো হিজরি বছরের দ্বিতীয় মাস তথা ‘সফর মাসের শেষ বুধবার’। আমাদের সমাজের অনেকে মানুষ হিজরি সফর মাসের শেষ বুধবারকে ইসলামী দিবস হিসেবে পালন করেন। এমনকি এ দিন সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কুরআন হাদিসের আলোকে এর কি কোন ভিত্তি আছে? বহু মানুষ সফর মাসের শেষ বুধবারকে একটি বিশেষ দিবস গণ্য করে এবং এতে বিশেষ আমল রয়েছে বলে মনে করে। এ ধরণের ভিত্তিহীন রসম-রেওয়াজের উলে­খ কুরআন-হাদিসে নেই, তবে কিছু অনির্ভরযোগ্য কিতাব ও পত্র-পত্রিকাতে এই বিষয়টি পাওয়া যায়। আখেরি চাহার শোম্বা সম্পর্কে কিছু কিতাব ও পত্র-পত্রিকাতে বলা হয়েছে, এদিন দু’জাহানের সর্দার মহানবী সাল­াল­াহু আলাইহিস সাল­ামের রোগমুক্তির দিন। আর এ কারণেই এদিন মুসলমানদের জন্য আনন্দময় ও পবিত্র দিন। হাদীসে নাকি বর্ণিত আছে, এক ইহুদি কবিরাজ রাসূল (সাঃ)-এর চুল মোবারক নিয়ে জাদুটোনা করেছিল। ফলে মহানবী (সাঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অসুস্থতার কারণে তিনি কিছুদিন মসজিদে নববীতে যেতে পারেননি। সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি সুস্থতা বোধ করে গোসল করেন এবং দু’জন সাহাবীর কাঁধে ভর করে মসজিদে নববীতে গিয়ে জামাআতে নামায আদায় করেন। রাসূল (সাঃ)-এর রোগমুক্তির সংবাদে খুশি হয়েছিল মুসলিম জাহান। খুশি হয়ে হযরত ওসমান (রাঃ) তাঁর নিজ খামারের ৭০টি উট জবাই করে গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। খুশিতে আত্মহারা সাহাবীগণ আনন্দ প্রকাশ ও শুকরিয়া আদায় করেছিলেন রোযা রেখে, নফল নামায পড়ে এবং হামদ-নাত গেয়ে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন মাজার ও দরগায় রোগমুক্তি ও মছিবত দূর করার জন্য বিশেষ বিশেষ আমল করা হয়। আরো মজার ব্যাপার হলো, এ’দিন অনেক দরবারে এক বিশেষ আংটি তৈরি করে রাখা হয়। অনেকে এদিনে রোগমুক্তির জন্য মানত করে গোসল করে থাকেন। অনেকে এদিনে গরিব-দুঃখীদের মাঝে তৈরি খাদ্য বিতরণ করে থাকেন। 
অনিভর্রযোগ্য ও বিতর্কিত কয়েকটি কিতাব বলা হয়েছে- হিজরি একাদশ সনের সফর মাসের শেষভাগে নবী করীম (সাঃ) অত্যন্ত অসুস্থ এবং পীড়িত হয়ে পড়েন। তারপর এই মাসের শেষ বুধবার দিন তিনি একটু সুস্থ বোধ করায় গোসলাদি করে কিছুটা শান্তি লাভ করেন। এই গোসলই হুজুরের জীবনের শেষ গোসল ছিল। এরপর তাঁর জীবনে আর গোসল করার ভাগ্য হয় নাই। অতএব, এই দিন মুসলমানদের বিশেষভাবে গোসলাদি করে নফল নামায এবং রোযা ইত্যাদি আদায় করে নবী করীম (সাঃ)-এর রূহের উপর সওয়াব বখশিস করা উচিত। এ সমস্ত কিতাবে, সফর মাসের শেষ বুধবার কেন্দ্রিক বিশেষ ধরণের নামাযের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, সেখানে সফর মাসের শেষ বুধবার প্রভাতে গোসল করে সূর্য উঠার পর দুই রাকআত নফল নামায আদায় করার কথা উলে­খ আছে। নামাযের নিয়মে বলা হয়েছে, দুই রাকআতের নিয়ত করে এ নামায আদায় করতে হয়। উভয় রাকআতে সূরা ফাতিহার পর এগার বার সূরা ইখলাস পাঠ করতে হয়। নামায শেষে সত্তর বার নির্দিষ্ট একটি দরূদ শরীফ ও দু’আ পাঠ করে মুনাজাত করতে হয়। 
এ গুলো সবই মনগড়া। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র নেই। হাদিসের কোন নির্ভরযোগ্য কিতাব খুঁজে এর কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি বেশ কয়েকজন বিজ্ঞ আলেমের সঙ্গে। সকলেই বলেন যে, এর কোন ভিত্তি নেই। আসুন, আমরা সকল ভিত্তিহীন রসম-রেওয়াজ পরিহার করে কুরআন, হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের দেখানো পথে চলে জীবনকে আলোকিত করি।
(লেখক: মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, সিডনী থেকে)

প্রিন্ট

আরও সংবাদ