খুলনা | সোমবার | ০৪ মার্চ ২০২৪ | ২১ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রতিবেশীর প্রতি করণীয়

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০২:১৪ এ.এম | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩


প্রতিবেশী মূলত নিজ বাড়ির আশেপাশে বসবাসকারীদেরকে বলা হয়। সে আত্মীয়ও হতে পারে আবার অনাত্মীয়ও। মুসলিমও হতে পারে আবার অমুসলিমও। বন্ধুও হতে পারে আবার শত্র“ও। পূণ্যবানও হতে পারে আবার পাপীও। উপকারীও হতে পারে আবার ক্ষতি সাধনকারীও। প্রতিবেশী বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। যেমন- কর্মক্ষেত্রে একসাথে কাজ করলে সে আমার একজন প্রতিবেশী, ছাত্র জীবনে যাদের সাথে পড়া লেখা উঠাবসা করি সেও আমার প্রতিবেশী, আমার জমিনের সাথে যদি কারোও জমি থাকে সে আমার জমিনের প্রতিবেশী, পাশের দোকানদার সে আমার দোকানের প্রতিবেশী, একসাথে বাজারে গেলে সে আমার বাজারের প্রতিবেশী, যুদ্ধের ময়দানে এক যোদ্ধা আর এক যোদ্ধার প্রতিবেশী। এমনকি যদি আমি কোনো গাড়ি বা বিমানে একজন ভাইয়ের সাথে একসাথে বসি সেও আমার কিছু সময়ের জন্য একজন প্রতিবেশী।
ইসলামী শরী’আতে প্রতিবেশীর প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং তার অধিকার খুব বড় করে দেখা হয়েছে। প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কিত ইসলামে যে নির্দেশনা রয়েছে তা সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করব, ইনশাল্লাহ্।
১. প্রতিবেশীকে সম্মান করা। ২. একে অপরের সুখ-দুঃখের শরিক হওয়া। ৩. হাদিয়া দেওয়া। ৪. ভালো কিছু রান্না হলে প্রতিবেশীর বাড়িতে পাঠানো।
৫. নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস আদান-প্রদান করা: দৈনন্দিন জীবনে আমাদের ছোটখাট অনেক জিনিসেরই প্রয়োজন হয়। যেমনঃ লবণ, পানি। যা খুবই স্বল্প মূল্যের জিনিস, অথচ তা খুবই প্রয়োজনীয়। না হলে চলাই মুশকিল। স্বল্প মূল্যের জিনিস হলেও অনেক সময় পরিস্থিতি এমন হয় যে তা হাতের নিকট থাকে না। তখন খুবই স্বাভাবিক যে মানুষ এ সময়ে প্রতিবেশীর দ্বারস্থ হবে। এই প্রয়োজনের সময় সাধারণ বস্তুগুলি যদি কেউ দিতে না চায় তাহলে নিশ্চয়ই তা অনেক কষ্টের কারণ হবে।
৬. প্রতিবেশী দাওয়াত করলে তা কবুল করা। ৭. প্রতিবেশী কোন কল্যাণ প্রাপ্ত হলে খুশি হয়ে তাকে মুবারকবাদ দেয়া। ৮. বিপদে পড়লে সমবেদনা জ্ঞাপন করা। ৯. অসুস্থ হলে খোঁজ খবর নেওয়া। ১০. পরস্পর সালাম বিনিময় করা। ১১. ঋণ চাইলে সামর্থ্য অনুযায়ী ঋণ দেওয়া।
১২. প্রতিবেশীর অবর্তমানে তার পরিবার-পরিজনের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং ধন সম্পদ হেফাজত করা: মানুষকে বিভিন্ন কারণে সফরে যেতে হয়। এ সময়ে তাদের স্ত্রী সন্তান নিরাপত্তাহীনতা বা ভয়ভীতির ভিতরে থাকতে পারে। এ সময়ে তাদের খোঁজ খবর নেওয়া, প্রয়োজন পুরা করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। বাড়িতে বয়স্ক পিতা-মাতা থাকতে পারে, তাদের দেখাশুনা করা, অসুস্থ হলে সেবা- শুশ্র“ষা করা।
১৩. প্রতিবেশীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া: অনেক সময় এমন হয়, প্রতিবেশীর প্রয়োজনে কিছু ছাড় দিতে হয়। কিংবা নিজের কিছু ক্ষতি স্বীকার করলে প্রতিবেশীর অনেক বড় উপকার হয় বা সে অনেক বড় সমস্যা থেকে বেঁচে যায়। তেমনি একটি বিষয় হাদীস শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে, যা মুমিনকে এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে।
রসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো প্রতিবেশী যেন অপর প্রতিবেশীকে তার দেয়ালে কাঠ স্থাপন করতে বাঁধা না দেয়। (সহীহ বুখারী)
ইসলামী শরীয়াতে ‘হক্কে শুফ্আ’ প্রতিবেশীর একটি গুরুত্বপূর্ণ হক। নিজের জমি বা বাড়ি যদি কেউ বিক্রি করতে চায় তাহলে সে ব্যাপারে পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশীর হক সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ তাকে আগে জানাতে হবে যে, আমি আমার বাড়ি বা জমি বিক্রি করতে চাই তুমি তা কিনবে কি না। যদি সে কিনতে না চায় তাহলে অন্যের কাছে বিক্রি করা যাবে। তাকে না জানিয়ে কারো কাছে বিক্রি করা যাবে না। করলে সে দাবি করতে পারবে যে, আমি এই জমি ক্রয় করব। এটা তার হক। কারণ, হতে পারে এ জমিটি তার প্রয়োজন বা এমন ব্যক্তি তা ক্রয় করল যার কারণে সে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে ইত্যাদি। আর একেই শরী’আতের পরিভাষায় ‘হক্কে শুফ্আ’ বলে। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
১৪. কষ্ট না দেওয়া: নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কোন ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, ‘যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না।’ (বুখারী)
১৫. ক্ষতি না করা: অনেক সময় এমন হয় যে দুই প্রতিবেশী তাদের বাড়ির সীমানা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। যে প্রতিবেশীর শক্তি বেশি সে জোরপূর্বক নিজের সীমানা বাড়িয়ে নেয়। এটা বসতবাড়ির ক্ষেত্রে যেমন হয় ফসলের জমির প্রতিবেশীর সাথে আরো বেশি হয়। যাকে বলে ‘আইল ঠেলা’। সামান্য জমিন ঠেলে সে নিজের ঘাড়ে জাহান্নাম টেনে আনল। যতটুকু জমিন সে জবরদস্তিবশতঃ বাড়িয়ে নিল সে নিজেকে তার চেয়ে সাতগুণ বেশি জাহান্নামের দিকে ঠেলে নিল। হাদীস শরীফে এসেছে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘাত জমি দখল করল, কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত তবক পরিমাণ তার গলায় বেড়ি আকারে পরিয়ে দেয়া হবে। (মুসলিম ) (প্রতিবেশীর হক : সচেতনতা প্রয়োজন)
১৬. ভাল প্রতিবেশী হওয়ার চেষ্টা করা: আমি কারো জন্য মন্দ প্রতিবেশী হব না। যেমনিভাবে আমি চাই না যে, আমার প্রতিবেশীটি মন্দ হোক তেমনিভাবে আমাকেও ভাবতে হবে। ১৭. প্রতিবেশীর কষ্টদায়ক আচরণ যত দূর সম্ভব সহ্য করা। ১৮. প্রতিবেশীর দোষ ঢেকে রাখা।
১৯. সম্মতি ব্যতীত প্রতিবেশীর বাড়ি অপেক্ষা উঁচু বাড়ি না বানান: প্রতিবেশীর সম্মতি ব্যতীত নিজের বাড়ি উঁচু না বানানো যাতে তার বাড়ির বাতাস বন্ধ হয়ে যায়। হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসের একাংশে, রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,... যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’য়ালা ও আখিরাতের দিনের উপর ঈমান রাখে তার কর্তব্য হল সে যেন আপন বাড়ীর ইমারত তার ইমারত হতে এইরূপ উঁচু করো না, যেন তার ঘরে বাতাস বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য তার অনুমতিক্রমে হলে ভিন্ন কথা। (তরগীব)
২০. দ্বীনি শিক্ষা দান, সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে থেকে বারণ করা: মুসলিম-অমুসলিম, ছোট বড় সকল প্রতিবেশীকেই আল্লাহর হুকুম পালনে যতœশীল করে তোলা এবং দ্বীনি শিক্ষার আলো তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াও প্রতিবেশীর অন্যতম হক। এই হক আদায় না করা হলে দুনিয়াতেই আল্লাহর কঠিন আযাবে নিপতিত হওয়ার ধমকি দেয়া হয়েছে হাদীস শরীফে। ২১. মৃত্যুবরণ করলে দাফন কার্যসম্পন্ন পর্যন্ত সঙ্গ দেওয়া।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা প্রতিবেশীর যথার্থ কল্যাণ কামনার মাধ্যমে আমাদের তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করার তৌফিক দান করুন, আমিন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ। সংকলক : লেখক ও গবেষক।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ