খুলনা | বুধবার | ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ২৮ মাঘ ১৪৩২

করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ৪)

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:২৫ এ.এম | ১৫ জুন ২০২১

পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল­াহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘অহঙ্কারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্ব ভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কন্ঠস্বর নীচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর’। (সূরা লোকমান : ১৭-১৮)
‘কিবর’ আরবী শব্দ এর অর্থ বড়ত্ব, বড়াই, অহঙ্কার। অন্যের চাইতে নিজেকে বড় মনে করাই এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য।
পরিভাষায় কিবর হচ্ছে, হককে দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করা এবং কোন বিষয়ে নিজেকে বড় মনে করে অন্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।
হককে প্রত্যাখ্যান করা অর্থ হককে অস্বীকার করা, হককে কবুল না করে তার প্রতি অবজ্ঞা করা এবং হক কবুল করা হতে বিরত থাকা।
মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা অর্থ মানুষকে নিকৃষ্ট মনে করা, অবজ্ঞা করা, তুচ্ছ মনে করা ও মানুষকে ঘৃণা করা। অন্যের গুণের থেকে নিজের গুণকে বড় মনে করা। কারো কোন কর্মকে স্বীকৃতি না দেওয়া, কোন ভালো গুণকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা না থাকা।
ড. মুশফিক আহমেদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, অহঙ্কারের মেজাজ হল, নিজেকে উপরে উঠানো এবং অন্যকে নীচে নামানো, অন্যকে নিজের থাবার মধ্যে আনা। যেমন বিড়াল যদি ইদুরকে পায় থাবা দিয়ে আহত করে এবং ছেড়ে দেয়। ইদুর আহত অবস্থায় আস্তে আস্তে গর্তের দিকে চলে। ঠিক গর্তে পৌঁছার পূর্ব মুহূর্তে বিড়াল আবার ইদুরকে ধরে এবং আছাড় দেয়। আগে ধরে না। সে মজা দেখে। ঠিক গর্তে ঢোকার পূর্ব মুহূর্তে ধরে। এটার মধ্যে সে আনন্দ পায়। অহঙ্কারের মেজাজ ঠিক এ ধরনের। অন্যকে আঘাত করবে, অন্যকে অধিনস্থ রাখবে, নিজেকে উপরে উঠাবে, আর এটা দেখে সে আনন্দ পাবে।
অভিশপ্ত ইবলিসের কুফরী করা ও আল্লাহর আদেশের অবাধ্য হওয়ার একমাত্র কারণই ছিল তার অহঙ্কার। সৃষ্টিজগতের প্রথম মানব আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা’য়ালা ফেরেশতাদের আদেশ করেছিলেন, “তোমরা আদমকে সিজদা কর”। সকল ফেরেশতা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু ফেরেশতাদের মাঝে বেড়ে ওঠা শয়তান মাটি আর আগুনের যুক্তি হাজীর করল। সে আগুনের তৈরি বলে মাটির তৈরি মানুষকে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানাল। কুরআনের ভাষায়ঃ সে অস্বীকৃতি জানাল এবং অহঙ্কার করল। আর সে ছিল কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা বাকারা : ৩৪)
মহান আল্লাহ তা’য়ালা যদি ইবলিসকে বলতেন, আমাকে ১০০ সিজদা কর, তাহলে ইবলিস ১০০ কেন ১০০০ সিজদা করত। কিন্তু ইবলিস নিজেকে বড় মনে করল। সে অহঙ্কার করল যে, সে আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
করোনা মহামারীর মাধ্যমে মহান আল্লাহ যাদের অহঙ্কারকে চুর্ণবিচুর্ণ করে দিলেনঃ
১. এক শ্রেণির রাজত্বের অধিকারীদের, যারা মনে করত তাদের রাজত্ব’ই সকল সফলতার চাবিকাঠি। যাদের সামনে তাদের জনগণ ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু তাদের রাজত্ব তখন তাদের কোনই কাজে আসেনি।
২. এক শ্রেণির সম্পদশালীদের, যারা মনে করত তাদের সম্পদ’ই সকল প্রয়োজন পুরা করনেওয়ালা। যাদের সামনে তাদের প্রিয়জনেরা ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু তাদের সম্পদ তখন তাদের কোনই কাজে আসেনি।
৩. এক শ্রেণির প্রযুক্তিবিদদের, যারা মনে করত তাদের প্রযুক্তি’ই সকল শক্তির উৎস্য। যাদের সামনে তাদের দেশের জনগণ ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু না তাদের পারমানবিক শক্তি, বোমারু বিমান, সাবমেরিন কোন কাজে এসেছে।
৪. এক শ্রেণির জ্ঞানীদের, যারা মনে করত তাদের জ্ঞান’ই সকল সমস্যার সমাধান করনেওয়ালা। এজন্য তারা একে অপরের উপর জ্ঞানের বড়াই করত, তর্ক বিতর্কে লিপ্ত থাকত। যাদের সামনে অসংখ্য মানুষ ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু তাদের জ্ঞান তখন তাদের কোনই উপকার পৌঁছায়নি।
৫. এক শ্রেণির আমলকারীর, যারা মনে করত তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম, তাদের আমল যে কোন সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম, আর এ নিয়ে তাদের মধ্যে আত্ম তৃপ্তিও ছিল। তাদের সামনেও অসংখ্য মানুষ ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু তাদের আমল তখন তাদের কোন কাজে আসেনি।
৬. এক শ্রেণির সাধক ও তাদের অনুসারীদের, যারা মনে করত তাদের গুরু প্রবল আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী, নিমিষেই যে কোন অসম্ভবকে সম্ভবে পরিনত করতে পারে। তাদের গুরুর সামনেও অসংখ্য শিষ্য ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু তখন তাদের গুরু তাদেরকে বাঁচাতে পরেনি।
৭. এক শ্রেণির অবাধ্য ও অবিশ্বাসির, যারা মনে করত ধর্মের বাঁধন’ই সকল উন্নতির অন্তরায়, অতএব ধর্ম হতে বেরিয়ে গেলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাদের সামনেও অসংখ্য মানুষ ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু তাদের অবিশ্বাস তখন তাদের কোন কাজে আসেনি, শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকতে হয়েছে।
৮. এক শ্রেণির ভাগ্যগণনাকারীর (জ্যোতিষী), যারা মানুষের, গোত্রের, দলের ও দেশের ভবিষ্যৎ বলে দিত। যা ছিল এক চরম ভন্ডামি। করোনা তাদের মুখোশ উম্মচোন করে দিল। এখন আর তারা বলতে পারেনা করোনা কবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে?
মহান আল­াহ তা’য়ালা এই মহামারী হতে আমাদের যে শিক্ষা দিলেন- তিনিই আল­াহ! যিনি সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাশীল এবং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। যার ক্ষমতা স্বয়ংসম্পূর্ণ। যেখানে কোন প্রকার ত্র“টি, অপূর্ণতা ও দুর্বলতার লেশমাত্র নেই। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেছেন এবং যা ইচ্ছা তাই করছেন এবং যা ইচ্ছা তাই করবেন। কুরআনের ভাষাঃ যারা আল­াহর পরিবর্তে অপরকে সাহায্যকারীরূপে গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার ন্যায়, যে ঘর বানায় এবং নিশ্চয় সবচাইতে দুর্বল ঘর হল মাকড়সার ঘর, যদি তারা জানত। (সূরা আনকাবুত : ৪১) এ জন্য আমাদের একমাত্র সেই মহান মালিকের রহমতের উপরেই ভরসা করা উচিৎ।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুণ। (আমিন)

লেখক : বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা।

প্রিন্ট