খুলনা | শনিবার | ১৮ মে ২০২৪ | ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী |
০২:০২ এ.এম | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩


মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং আল­াহতায়ালা বলেন, নিশ্চয় আপনি (হে মুহাম্মদ) মহান চরিত্রের অধিকারী (সূরা কলম: ৪)। আর এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আল­াহর রসূলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ (সুরা আহজাব: ২১)। একজন আমেরিকান অমুসলিম বিজ্ঞানী মাইকেল এইচ হার্ট তার ‘দি হানড্রেড্স’ বইতে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জনের তালিকা তৈরি করেছেন। তাতে সবার শীর্ষে যার নাম দিয়েছেন তিনি হলেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল­াল­াহু আ’লাইহি ওয়া সাল­াম। আসলেই তিনি আদর্শের বিশ্বকোষ, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। উন্নত চরিত্র, উত্তম আখলাক ও ব্যবহারের পূর্ণতা পেয়েছে মহানবীর মাঝে। 
রাসূলের ভিতরে (সাঃ) অহঙ্কারের লেশ মাত্র ছিলনা। তিনি সবার আগে মানুষকে সালাম দিতেন এবং বলতেন, যে আগে সালাম দেয় সে অহঙ্কার মুক্ত। তিনি সাহাবাদের সাথে এমনভাবে মিশে বসতেন যে, কোন আগন্তুক এসে চিনতে পারতো না কে আল­াহর রাসূল। এ কারণে অধিকাংশ সময়ে তারা জিজ্ঞাসা করতো, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে? 
ক্ষমা ও মহানুভবতা ছিল মহানবীর (সঃ) সহজাত অভ্যাস। প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ থাকা সত্তে¡ও তিনি চরম শত্র“কেও ক্ষমা করে দিতেন। মক্কার কাফির, মুশরিকরা হুজুরকে (সাঃ) প্রাণে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছে, অত্যাচারের স্টীম-রোলার চালিয়ে তার উপর। তারপরও তিনি মক্কা বিজয়ের দিনে ঘোষণা করলেন, ‘হে কুরাইশরা! তোমরা আমার কাছ থেকে আজ কেমন ব্যবহার আশা করো?’ তারা বলল, সম্মানিত ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্রের মতো! তিনি বললেন, ‘তোমরা চলে যাও! আজ তোমরা মুক্ত!’ বিনা রক্তপাতের এমন বিজয়, আর বিজয়ের পরে সাধারণ ক্ষমার এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবী কি কখনও দেখেছে ? এক ইহুদী বুড়ি তাকে বিষ প্রয়োগ করেছিল, তারপরও তিনি তাকে মাফ করে দিয়েছিলেন। 
আল­াহর নবী (সঃ) ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। তিনি এতোই নরম প্রকৃতির ছিলেন যে মদীনার সাধারণ বাচ্চারাও তার হাত ধরে শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে নিয়ে যেতে পারতো। তিনি সাহাবায়ে কেরামকেও (রাঃ) মানুষের প্রতি নম্র আচরণের উপদেশ দিয়ে বলতেন, তোমরা ন¤্র ব্যবহার করো এবং কঠোর ব্যবহার করো না। মানুষকে শান্তি দাও এবং মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না (বুখারি: ৫৬৯৪)। 
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, একবার এক বেদুঈন মসজিদে পেশাব করে দিলো। তখন লোকজন তাকে শাসন করার জন্য উত্তেজিত হয়ে পড়ল। রাসূলুল­াহ (সাঃ) তাদের বললেনঃ তোমরা তাকে ছেড়ে দাও এবং তার পেশাবের উপর পানি ঢেলে দাও। কারণ, তোমাদের ন¤্র ব্যবহারকারী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, কঠোর ব্যবহারকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি (বুখারি: ৫৬৯৮)। 
সকল রাসূলের সেরা হয়েও মহানবী (সাঃ) ছোট-বড়, শিশু-বৃদ্ধ সবার সাথে মন খুলে মিশতেন। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, আমাদের সাথে নবীজি (সঃ) মেলামেশা করতেন, এমনকি একদিন তিনি আমার এক ছোট ভাইকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ ওহে আবু উমার, তোমার নুগায়র পাখিটি কেমন আছে (বুখারি: ৫৬৯৯)? দানশীলতা ছিল তার মজ্জাগত অভ্যাস। আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবীজি (সঃ) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সবার চাইতে অধিক দানশীল এবং লোকদের মধ্যে সর্বাধিক সাহসী ছিলেন (বুখারি: ৫৬০৭)। কেউ কিছু চাইলে তিনি তাদেরকে খালি হাতে ফেরাতেন না। জাবির (রাঃ) বলেন, নবী (সঃ) এর নিকট এমন কোন জিনিসই চাওয়া হয় নি, যার উত্তরে তিনি ‘না’ বলেছেন (বুখারি: ৫৬০৮)।
নিঃস্ব, অসহায় ও এতিমদের প্রতি দয়ার শেষ ছিলনা মহানবী (সঃ)-এর। কিভাবে গরীব মানুষের মুখে হাঁসি ফোটানো যায় এই জন্য সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। তিনি তাদেরকে খুব ভালোবাসতেন এবং সাহাবাদেরকেও ভালোবাসা ও দয়ার হাত প্রসারিত করার জন্য উৎসাহ প্রদান করে বলতেন, যদি কোন ব্যক্তি কোন বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান করে আল­াহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সবুজ বস্ত্র পরিধান করাবেন। যদি কেউ কোন ক্ষুধার্তকে খানা খাওয়ায় আল­াহপাক তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। আর যদি কেউ কোন  পিপাসিতকে পানি পান করায় মহান আল­াহপাক তাকে জান্নাতের মোহরযুক্ত পানীয় পান করাবেন (আবু দাউদ, তিরমিজী)। আর এক হাদিসে নবীজি (সঃ) এরশাদ করেন, আমি ও এতিমের তত্ত¡াবধানকারী জান্নাতে এভাবে (পাশাপাশি) থাকবো। এ কথা বলার সময় তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল মিলিয়ে ইশারা করে দেখান (বুখারী:৫৫৭৯, তিরমিজী :১৯১৮)। 
ঈদ অর্থ আনন্দ; আর মিলাদুন্নবী অর্থ নবীর জন্ম। নবীর জন্ম উপলক্ষে যে আনন্দ কর্মসূচি তাকেই বলা হয় ঈদে-মিলাদুন্নবী। তবে এটাকে সীরাতুন্নবী বলাই অধিক অর্থবহ। পৃৃথিবীতে সুমহান আদর্শ ও উন্নত আখলাক প্রতিষ্ঠা করার জন্যই আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইংরেজী ৫৭০ সনে এবং আরবী ক্যালেন্ডারের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল মাসের ৯ কিংবা ১২ তারিখ সোমবার বিশ্ব-মানবতার মুক্তিদূত মহানবী (সাঃ) জন্মগ্রহণ করেন। মহানবীর চরিত্র ও আদর্শের কথা লিখে কখনও শেষ করা যাবে না। তিনি আমাদের সকলের জন্য আদর্শ। তাই আসুন, আমরা শুধুমাত্র মিষ্টি খাওয়া, র‌্যালি-করা, আর একটি নির্দিষ্ট দিনে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে সারাবছরই মহান নবীর মহান আদর্শের আলোচনা অব্যাহত রাখি এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তার আদর্শকে ছড়িয়ে দিয়ে এক সুস্থ সমাজ গড়ি। 
লেখক : মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, সিডনি থেকে।

প্রিন্ট