খুলনা | সোমবার | ২০ মে ২০২৪ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

অদ্ভুত রহস্যময় এক চরিত্র বহুব্যক্তিত্বের বিকৃতি

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী ও সাইকোথেরাপিস্ট |
০১:৩০ এ.এম | ২৭ অক্টোবর ২০২৩


কেসস্ট্যাডি- ১, শিপ্রা (ছদ্ম নাম) ম্যাডাম অফিসের একজন বস। তার জীবন ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অহংসত্তায় নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন। কখনো ফারহানা, কখনো শিরিন আবার কখনো বা জান্নাতারা নামে নিজের অহংসত্ত¡ার আত্মপ্রকাশ করে থাকেন। মজার ব্যাপার এই যে প্রতিটি অহংসত্ত¡ায় তার স্বতন্ত্র চারিত্রিক আচরণ প্রকাশ পেয়ে থাকে। আরো অদ্ভুত ব্যাপার এই যে এক অহংসত্ত¡ায় অবস্থান করার সময় তিনি অন্য অহংসত্ত¡ার বৈশিষ্ট্যসমূহ মনে করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হন।
কেস স্ট্যাডি-২, তাহেরা, (ছদ্ম নাম) বয়স ৩৫ বছর।  ইদানিং তিনি প্রায় প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখতে পান যে বিছানার পাশে ছোট টেবিলের উপর চা খাওয়ার কাপ এবং অবশিষ্ট চাও পড়ে আছে। কিন্তু তিনি জোরালো ভাবে স্বীকার করে যাচ্ছেন যে-তিনি নাকি চা মোটেও পছন্দ করেন না এবং চা খেয়েছে এমনটা মনেও করতে পারছে না।
এ সব ঘটনা আসল অর্থ ব্যাখ্যা করা বড়ই কঠিন। আপনি বা আপনার পরিচিত জন যদি এমন কোন একটি মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন এবং উপরের উলে­খিত ঘটনা সমূহ বলে থাকেন; তবে তাহা কেউই বিশ্বাস করতে চাইবে না, এতে করে আপনার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে যাবে। আসলে সত্য এমন হতে পারে-যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় উপরোক্ত মহিলা দু’জনই বহুব্যক্তিত্বের বিকৃতিতে আক্রান্ত ; যাকে বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতি হিসেবে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতির লক্ষণ: সত্যিকার অর্থে কখনো কখনো আমরা এমন কিছু আচরণ করে থাকি,যা আমাদের অন্য মানুষ হিসেবে নির্দেশ করে। এটা অনেকটা স¦াভাবিক। এটাকে বহু ব্যক্তিত্ব নির্দেশ করে না। বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতি নির্দেশ করতে হলে একজন ব্যক্তির কমপক্ষে দু’টি পৃথক অহংসত্তা থাকতে হবে। দু’টি ব্যক্তিত্বই একান্তরভাবে পরিবর্তন যোগ্য। এক ব্যক্তিত্বের নিজস্ব আচরণের ধারা, অনুভূতি, আবেগ, স্মৃতি অন্য ব্যক্তিত্ব থেকে পৃথক। পৃথক ব্যক্তিত্ব সমূহ বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত হবে। উপস্থিত ব্যক্তিত্ব চলমান সময়ে ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করবে। একটি ব্যক্তিত্ব বা সত্তা অন্য ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানতে পারে না। অর্থাৎ একাধিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে স্মৃতির একটি ফাঁক তৈরি হয়। বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতির আরেকটি শর্ত হলো এই যে-ব্যক্তিত্বের দুই বা ততোধিক ধরণের পরিবর্তন স্থায়ী হতে হবে এবং এর ফলে তার জীবনে বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। উলে­খ কোন ঔষধ বা মাদক দ্রব্য সেবনের ফলে ব্যক্তিত্বের যে সব ক্ষণস্থায়ী পরিবর্তন ঘটে থাকে, তাকে বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না। বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতিতে ব্যক্তিত্বের সত্তা সমূহ পরস্পর হতে আলাদা, এমনকি কি বিপরীত ধর্মীও হতে পারে। এক ব্যক্তিত্বে যদি ডান হাত প্রাধান্য হয়, তবে অন্য ব্যক্তিত্বে রূপান্তর হয়ে বাম হাত প্রধান হতে পারে। এক ব্যক্তিত্বে ব্যক্তির গরম ভালো লাগলে অন্য ব্যক্তিত্বে ঠান্ডা ভালো লাগতে পারে।
বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতির কারণ সমূহ: মনোসমীক্ষণ তত্ত¡ অনুসারে সব ধরনের বিচ্ছিন্নতার কারণ হলো ব্যাপক অবদমন। ব্যক্তি যখন তীব্র পীড়নমূলক পরিস্থিতি হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য পীড়নমূলক অভিজ্ঞতাকে অবদমন প্রক্রিয়া আশ্রয় গ্রহণ করে তখন বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতি দেখা দিতে পারে। আচরণবাদীদের মতে, বিচ্ছিন্নতামূলক প্রতিক্রিয়া হলো পীড়াদায়ক ঘটনা বা তার স্মৃতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ব্যক্তির একটি পরিহার মূলক প্রতিক্রিয়া। অনেক শিশু চরম তীব্র পীড়নমূলক পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে আত্ম-সম্মোহন প্রক্রিয়ার মাধ্যম হিসেবে বিচ্ছিন্নমূলক প্রতিক্রিয়া শিখতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, যাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতামূলক বিকৃতি রয়েছে তাদের আত্মসম্মোহন প্রবণ, তা অন্যান্যদের তুলনায় বেশি। গবেষণায় আরো দেখা গেছে যে, বিচ্ছিন্নতামূলক মনোবিকৃতির সাথে তীব্র পীড়নের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। জরীপে দেখা গেছে শিশুকালের শারীরিক শাস্তি ও যৌন নিপীড়ন ব্যক্তির মধ্যে পরবর্তীতে তীব্র পীড়নের সৃষ্টি করে যার সাথে বিচ্ছিন্নতামূলক মনোবিকৃতির গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান থাকতে পারে। 
বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতির চিকিৎসা: (১) চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হবে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। (২) প্রত্যেকটি পরিবর্তিত ব্যক্তিত্বকে সাহায্য করতে হবে যেন সে বুঝতে পারে যে সে একই ব্যক্তিত্বের অংশ। (৩) প্রত্যেকটি পরিবর্তিত ব্যক্তি সত্তার সাথে সদিচ্ছা ও সহানুভূতিমূলক আচরণ করতে করতে হবে। (৪) এই প্রকার মনোবিকৃতির জন্য শৈশবকালীন কোন না কোন পীড়ন দায়ী, তাই তাদের প্রতি সদয় ও সমর্থনমূলক আচরণ করতে হবে।   
বিচ্ছিন্নতামূলক আত্মপরিচয় বিকৃতি একটি জটিল মানসিক সমস্যা। তাই পরিবারের কোন সদস্যের মধ্যে এরূপ মানসিক সমস্যা দেখা দিলে একজন দক্ষ মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ গ্রহণ করে এ প্রকার মানসিক সমস্যা হতে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। 
(লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা। পরামর্শ-০১৭১৪৬১৬০০১) 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ