খুলনা | সোমবার | ২০ মে ২০২৪ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

জুনিয়র কনসালট্যান্ট না থাকায় সিজার অপারেশন বন্ধ

বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, জনবলও সংকট

মোঃ ইমরান হোসেন সুমন, বটিয়াঘাটা |
০১:১৮ এ.এম | ০৯ নভেম্বর ২০২৩


অর্থোপেডিক, চক্ষু, চর্ম, যৌন, শিশু, নাক-কান গলা ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো আজও সৃষ্টি করা হয়নি বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এছাড়া ওয়ার্ড বয় ও আয়ার পাঁচটি পদের সবগুলোই শূন্য। পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছে মাত্র ১ জন। আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে নেওয়া কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দেখভাল করছেন। অন্যদিকে সিজার অপারেশন বন্ধ থাকায় গর্ভবতী মায়েরা ডেলিভারির সময় হাসপাতালে ভর্তি হতে সাহস করেন না। কিন্তু তারা নিয়মিত হাসপাতালে চেকআপ করাতে আসেন। 
২০২১ সালের ৩১ এপ্রিল হাসপাতালে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান। তিনি যোগদানের পর থেকে অসংখ্য পদ শূন্য থাকার পরেও শতভাগ সেবা থেকে বঞ্চিত হননি উপজেলাবাসী। তার যোগ্য নেতৃত্বে হাসপাতালের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। প্রতিদিন তার রুমের সামনে শত-শত নারী পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু টিএইচও’র কাছ থেকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। 
উলে­খ্য, জাতীয় য²া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (Ntp)-এর আওতায় ইতোমধ্যে খুলনা জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে মধ্যে শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হয়েছে।  
সূত্রে প্রকাশ, বটিয়াঘাটা হাসপাতালটিতে ২০১৪ সালে অপারেশন থিয়েটার বা ওটি চালু হয়। তবে সেই থেকে ২০২২ সালের ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত সব ধরনের অস্ত্রোপচারই বন্ধ ছিল। ২০২২ সালের মার্চ মাসে অস্ত্রোপচার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকলেও এ্যানেসথেসিয়ায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসা কর্মকর্তা শামীম রহমান দায়িত্ব পালন করতেন। চলতি বছরের মার্চে তাকে শহিদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে বদলি করা হয়। এতে আবার অস্ত্রোপচার কার্যক্রম থমকে দাঁড়ায়। হাসপাতালে গত জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার ৯৬৩ জন রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছেন। অর্থাৎ মাসে গড়ে  সাড়ে ৫ হাজার রোগী বহির্বিভাগে সেবা নেন। 
গত ২২ সেপ্টেম্বর রোগীদের সঙ্গে আলাপকালে (সকাল ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত) জানা গেছে বিভিন্ন সমস্যার কথা। হাসপাতালটিতে একটি পুরাতন দ্বিতল ভবন ও একটি নতুন তিনতলা ভবন আছে। পুরাতন দ্বিতল ভবনটিতে কোনো রোগী রাখার ব্যবস্থা নেই। ভবনটি কিছুটা সংস্কার করে প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয়, ফার্মেসি ও সম্মেলন কক্ষ করা হয়েছে। 
চিকিৎসা নেওয়ার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কক্ষের সামনে রোগীর দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ১৯ শয্যার নতুন ভবনে সব রোগী রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে, বারান্দা ও সিঁড়িতে শয্যা পাতা। নতুন ভবনে দোতলায় হাসপাতালের অস্ত্রোপচারের কক্ষটি ছিল তালাবদ্ধ। ওটি ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স সুনেত্রা বিশ্বাসের সহযোগিতায় তালা খোলা হয়। 
দেখা যায়, অস্ত্রোপচারের জন্য সব সরঞ্জাম রয়েছে। পাশে পোস্ট অপারেটিভ কক্ষটিও সুসজ্জিত। তবে হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের কোনো ব্যবস্থা নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বটিয়াঘাটা হাসপাতালটি বিগত ১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারিতে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালে ৫০ শয্যার অনুমোদন পায়। কিন্তু অদ্যাবধি জনবলের অনুমোদন না পাওয়ায় ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে ৫০ শয্যার সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ৫০ শয্যা অনুযায়ী জুনিয়র কনসালট্যান্ট-এর পদ সংখ্যা হবে ১০টি, সহকারী সার্জন বা সমমান-এর পদ সংখ্যা হবে ১১টি, অন্যান্য পদে মিলিয়ে মোট ২৪ জন প্রথম শ্রেণির পদ হবে। কিন্তু বর্তমানে ৩১ শয্যার জনবলের তথ্য অনুযায়ী জুনিয়র কনসালট্যান্ট এর বর্তমানে পদ আছে ৪টি সেখানে ৩টি শূন্য অথচ আছে ১ জন।
জুনিয়র কনসালট্যান্ট সার্জারী এবং জুনিয়র কনসালট্যান্ট এ্যানেন্থেসিয়া পদ শূন্য আছে। উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের পদ ৭টি, কর্মরত ৭ জন, কিন্তু ২ জন দীর্ঘদিন যাবত ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত আছেন। অফিস শাখার পরিসংখ্যানবিদ, স্টোর কিপার, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং জুনিয়র  মেকানিক পদ শূন্য রয়েছে। ক্লিনিং শাখার ওয়ার্ড বয়-এর পদ ৩টি পদের সবগুলোই শূন্য। আয়া ২টি পদের সবগুলোই শূন্য। মালী ১ পদের ১টিই শূন্য। সুইপার ৫টি পদের মধ্যে ৪টি শূন্য, আছে ১ জন। নিরাপত্তা প্রহরী ২টি পদের মধ্যে ১টি শূন্য রয়েছে। 
বটিয়াঘাটার সুরখালী ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম (৬২) বুকে-পিঠে ব্যথা নিয়ে আটদিন ধরে হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন ডাঃ মিজান স্যার রাউন্ডে আসেন। এখানে খাওয়া-দাওয়াও ভালো। শুধু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে থেকে করতে হয়েছে। তবে প্রতিদিন ১/২ বার ডাক্তাররা খোঁজ খবর নেন। ভগবতিপুর গ্রামের অনিল মন্ডল (৬৪) বলেন, আমি মিজান স্যারের কাছে ২/৩ দিন দেখাইছি, হাসি মুখে সুন্দর-সুন্দর কথা বলে মাথায় হাত দিয়ে বলে এই ওষুধ ঠিকঠাক ভাবে খান সুস্থ হয়ে যাবেন। তার ব্যবহারে আমি অর্ধেক সুস্থ হয়ে গেছি। 
সার্বিক বিষয় জানতে চাইলে বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, ‘অস্ত্রোপচার কক্ষ চালু করতে পারলে অত্র অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হতো। অবেদনবিদ না থাকার পরও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক দিয়ে অস্ত্রোপচার কক্ষ চালু করেছিলাম। সেই চিকিৎসকও মার্চে বদলি হয়েছেন। গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁকে এখান থেকে না নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। জনবল সংকটের বিষয়টি প্রতি মাসের প্রতিবেদনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। 
শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত : জাতীয় য²া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (Ntp)-এর আওতায় ইতোমধ্যে খুলনা জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে মধ্যে শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মিজানুর রহমানের হাতে উপহার তুলে দেন খুলনা বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডাঃ মোঃ মনজুরুল মুরশিদ, বিএমএ খুলনার সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডাঃ মেহেদী নেওয়াজ, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাঃ সাফায়েত হোসেন ও সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ সজিবুর রহমান।
বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদানের পর থেকে ডাঃ মিজানুর রহমান নিরলস পরিশ্রম করে সীমিত জনবল নিয়ে। হাসপাতালের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি সাধারণ রোগীদের সেবা দিয়ে আসছেন। অত্র অঞ্চলের রোগীদের হৃদয়ে একজন ভালো ডাক্তার ও মানুষ হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন তিনি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ