খুলনা | শনিবার | ০৫ এপ্রিল ২০২৫ | ২২ চৈত্র ১৪৩১

টাকা সংকট, লেনদেন সেবা বন্ধের উপক্রম পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের

খবর প্রতিবেদন |
১২:৫৩ এ.এম | ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩


টাকার ঘাটতির কারণে দেশের শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক লেনদেন সেবা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। দীর্ঘদিন চলতি হিসাবের স্থিতি ঋণাত্মক থাকায় এসব ব্যাংককে ২০ দিনের মধ্যে অর্থ সমন্বয়ের সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংকটে থাকা শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংককে আগামী ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে চলতি হিসাবের টাকার ঘাটতি পূরণ করতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। না হলে এই ব্যাংকগুলোর লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নিয়ম অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্লিয়ারিং পেমেন্ট সিস্টেমের জন্য ব্যাংকগুলোর চলতি হিসাবে নির্ধারিত অর্থ রাখতে হয়। কিন্তু, ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাব গত এক বছর ধরে অর্থের ঘাটতিতে আছে।
গত ২৮ নভেম্বর এই পাঁচ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) ২০ কার্যদিবসের মধ্যে টাকার ঘাটতি মেটাতে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগ চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্র“পের মালিকানাধীন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চলতি হিসাবের স্থিতি ঋণাত্মক থাকলেও এসব ব্যাংককে এখন নিয়মিত টাকা ধার দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যাতে কোনো গ্রাহক তাঁদের জমানো টাকা তুলতে ব্যর্থ না হন।
এদিকে এক বছর ধরে তারল্যসংকটে ভুগছে ইসলামি ধারার এ পাঁচ ব্যাংক। এসব ব্যাংকে আমানত বাড়লেও চাহিদামতো নগদ জমা (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমার (এসএলআর) টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখছে না। ফলে নিয়মিত দন্ড সুদ বা জরিমানা গুণতে হচ্ছে। আবার এই জরিমানার টাকাও দিচ্ছে না কেউ কেউ। চিঠিতে যা বলা হয়েছে : নিয়ম অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয়ের সঙ্গে একটি চলতি হিসাব সংরক্ষণ করতে হয়। এই হিসাব থেকে সব লেনদেন নিষ্পত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি সিআরআরের টাকাও থাকে এই হিসাবে।
ব্যাংক পাঁচটিকে দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘মতিঝিল কার্যালয়ের ডিপোজিট এ্যাকাউন্ট বিভাগে রক্ষিত আপনাদের চলতি হিসাবের মাধ্যমে বিভিন্ন লেনদেন নিষ্পত্তি, যেমন চেক ক্লিয়ারিং সেবা (বিএসিপিএস), অনলাইন অর্থ স্থানান্তর (বিইএফটিএন), এটিএম ও ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে অন্য ব্যাংক থেকে সেবা গ্রহণ (এনপিএসবি) ও তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর (আরটিজিএস) সেবার লেনদেন সম্পন্ন হয়ে থাকে। আপনাদের চলতি হিসাবের স্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে যে চলতি হিসাবের স্থিতি দীর্ঘদিন যাবৎ ঋণাত্মক, যা স্বাভাবিক ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, পত্রপ্রাপ্তির ২০ কর্মদিবসের মধ্যে আবশ্যিকভাবে চলতি হিসাবের ঋণাত্মক স্থিতি সমন্বয়ের পরামর্শ প্রদান করা হলো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ সমন্বয়ে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সম্পাদিত ‘লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারিত হিসাবে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ’ চুক্তি অনুযায়ী সব বা নির্দিষ্ট কোনো নিষ্পত্তি ব্যবস্থা থেকে ব্যাংকগুলোকে বিরত রাখা হবে। অর্থাৎ এই পাঁচ ব্যাংকের চেক ক্লিয়ারিং, এটিএম ও অনলাইন ব্যাংকিং সেবা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 
জানা গেছে, গত বুধবার পর্যন্ত পাঁচটি ব্যাংক এই হিসাবের ঋণাত্মক স্থিতি সমন্বয় করেনি।
চিঠির বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) গণমাধ্যমে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ব্যাংকগুলোকে জাতীয় ক্লিয়ারিং সিস্টেম থেকে নিষিদ্ধ করে, তাহলে তারা অবৈধ হয়ে যাবে। কারণ তারা কোনো আন্তঃ ব্যাংক লেনদেন করতে পারবে না।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের এমডি সৈয়দ হাবিব হাসনাত চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে টাকা উদ্বৃত্ত আছে।
এস আলম গ্র“পের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের মেয়ে মাইমুনা খানম গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ভাইস-চেয়ারম্যান।
টাকার ঘাটতি মেটাতে বন্ড কেনা হয়েছে উলে­খ করে তিনি বলেন, ‘এখন সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে সংকট দেখা দিয়েছে, আমরাও সংকটে আছি।’
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ মনিরুল মওলার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসানুল আলম এস আলম গ্র“পের চেয়ারম্যানের বড় ছেলে।
বৃহস্পতিবার ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করেন এবং মনিরুল মওলাকে তার রুম থেকে বের হতে দেখা যায় বলে গণমাধ্যমে জানানো হয়।
এ বিষয়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এমডি জাফর আলমে মন্তব্যের জানতে চাওয়া হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে গত ৪ ডিসেম্বর তিনি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘গত এক সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার প্রয়োজন হয়নি।’
ইউনিয়ন ব্যাংকের এমডি এবিএম মোকাম্মেল হক চৌধুরী ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এমডি সৈয়দ ওয়াসেক মোঃ আলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি গণমাধ্যম কর্মীরা।
এস আলম গ্র“পের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনসহ আরও তিন আত্মীয় ব্যাংকটির পরিচালক।
সাইফুল আলমের জামাতা বেলাল আহমেদ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তার বোন জেবুন্নেসা আকবর, ভাগ্নে আরশাদুল আলম ও মাহমুদুল আলম ব্যাংকটির বোর্ডে আছেন।
ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আছেন সাইফুল আলমের ভাই ওসমান গনি ও রাশেদুল আলমসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
এস আলম গ্র“পের পরিচালক শহিদুল আলম, শাহানা ফেরদৌস ও ফারজানা বেগমসহ আরও পাঁচ আত্মীয় গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আছেন। 
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক সরাসরি কোনো কথা বলতে চাননি। তবে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো চিঠি দিয়ে থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। তারল্যসংকটে পড়া ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্নভাবে টাকা ধার নিয়ে থাকে। এরপর প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী তারল্য জমা রাখতে ব্যর্থ হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও পদক্ষেপ নিতে পারে। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সমস্যা আছে, এ জন্য কয়েকটি ব্যাংককে নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তাদের আমানতের ৪ শতাংশ সিআরআর হিসেবে চলতি হিসাবে সংরক্ষণ করতে হয়। মূলত আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এ বিধানের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকে আমানতের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখতে হয়। উলে­খিত পাঁচ ব্যাংকের কোনটি নির্দিষ্ট হারে সিআরআর রাখতে পারছে না। 
সূত্র : প্রথম আলো অনলাইন।

্রিন্ট

আরও সংবদ