খুলনা | শনিবার | ৩০ অগাস্ট ২০২৫ | ১৪ ভাদ্র ১৪৩২

মব সংস্কৃতি দমনে সরকার ব্যর্থ হলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে: ড. কামাল হোসেন

খবর প্রতিবেদন |
১২:৪৪ এ.এম | ৩০ অগাস্ট ২০২৫


দেশে সন্ত্রাস, সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও মব সংস্কৃতির এক নতুন প্রেক্ষাপট বিরাজ করছে, এই অশুভ শক্তিকে দমন করতে সরকার ব্যর্থ হলে দেশে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা এমিরেটাস সভাপতি বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন।

শুক্রবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর প্রেসক্লাবে গণফোরামের ৩১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ড. কামাল হোসেন বলেন,  আমি প্রথমেই ’২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে নিহত শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আহতদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। একইসঙ্গে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। ৩২ বছর আগে ১৯৯৩ সালের এই দিনে বাংলাদেশের বিরাজমান রুগ্ণ রাজনীতির বিপরীতে সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণফোরামের জন্ম হয়েছিল। গণফোরামের নীতি-আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজার হাজার নেতা-কর্মী সেদিন এই দলের পতাকাতলে সমবেত হয়ে সত্যিকার অর্থে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে অঙ্গীকার করেছিল।

গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশে গণতন্ত্রহীনতা ও নিপীড়নমূলক এক স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, ভোটাধিকার, মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ অবাধে লুটপাট, অর্থপাচার, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে দেশ শাসনে ভয়াবহ সংকট ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে গত জুলাই-২০২৪ ছাত্র-জনতার এক অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনরোষে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়।

তিনি আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধানে ‘প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ’ এ কথাটি দৃপ্ত শপথে লেখা থাকলেও বিগত ৫৪ বছরে জনগণই সব ক্ষমতা থেকে উপেক্ষিত হয়েছে। মহান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে মানুষ তার আত্মমর্যাদা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ’২৪-এর জুলাই সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন সমাজ, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কোনো অশুভ শক্তি বা ষড়যন্ত্র যেন এই রক্তস্নাত বিজয় ও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে ড. কামাল হোসেন বলেন, বিগত সরকার দলীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমূলে ধ্বংস করে রেখে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে, একটি অশুভ শক্তি বিগত আমলের মতোই সর্বত্র চাঁদাবাজি, দখলবাজি, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাস, সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও মব সংস্কৃতির এক নতুন প্রেক্ষাপট বিরাজ করছে। এই অশুভ শক্তিকে দমন করতে সরকার ব্যর্থ হলে দেশে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে, যা কারো কাম্য নয়।

তিনি আরও বলেন, গণফোরাম মনে করে, কেবল সরকার ও দল বদল নয়, জনগণের ভাগ্য বদলের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থবহ পরিবর্তন আনতে হবে। গণফোরামের লক্ষ্য বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক, মানবিক কল্যাণকামী রাষ্ট্র বিনির্মাণ। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিল যেমন শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে। এ দেশ তোমার, আমার, সবার। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা সবাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। এখন সময়ের দাবি প্রয়োজনীয় সংস্কার, অপরাধীদের বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচন; যাতে মানুষের আকাঙ্ক্ষিত একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ সুগম হয়। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এর প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। আশা করি বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আন্তরিকতার সঙ্গে তার অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে।

ড. কামাল হোসেনের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে পাঠ করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান।  

গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান, কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।