খুলনা | সোমবার | ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২

বিতর্কিত মাঠ প্রশাসন সুষ্ঠু নির্বাচন অগ্রাধিকার পাক

|
১২:০৯ এ.এম | ২৭ নভেম্বর ২০২৫


অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে গোড়াতেই বিতর্কের মুখে পড়েছে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ, বিশেষত জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ প্রক্রিয়া। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই নিয়োগ নিয়ে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মূলত, মাঠ প্রশাসনে ডিসি, এডিসি, ইউএনও এবং এসিল্যান্ডরাই নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকেন। দেশের নির্বাচন সংস্কৃতিতে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি তাদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমতাবস্থায় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ডিসিসহ তার টিমের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকে, তবে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক। স¤প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত একাধিক ডিসির বিরুদ্ধে বিগত ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সরাসরি তল্পিবাহক’ হওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে, যা প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
দেখা গেছে, অনেক নতুন ডিসিরই মাঠ প্রশাসনে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। কেউ কেউ ছিলেন প্রভাবশালী সচিবদের একান্ত সচিব (পিএস), অর্থাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থানকারী। নিয়োগ পাওয়ার পর বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় ছয়জনকে প্রত্যাহারও করা হয়েছে, যা প্রশাসনের অভ্যন্তরের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রামের ডিসির মতো কর্মকর্তাসহ চার ক্ষমতাধর সচিবের পিএস থাকাকালে ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ডিসি, যিনি ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা, সরাসরি মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই তার ডিসি পদে পদায়ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, নড়াইল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পদায়ন হওয়া ডিসির বিরুদ্ধেও আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের নিয়ে শেখ মুজিবের মাজারে ফুল দিয়ে শপথ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমন নজিরবিহীন নিয়োগের ঘটনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
একাধিক অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, অদক্ষ ও দলবাজ কর্মকর্তাদের দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করানো সম্ভব নয়। সরকারের সদিচ্ছাই এখানে মুখ্য। প্রশাসনযন্ত্রকে এভাবে বিতর্কিত করা মোটেই কাম্য নয়। তাদের মতে, অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে, সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত ডিসিদের দিয়েই সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করবে এবং তফশিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন চাইলে রদবদল করতে পারবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিতর্কমুক্ত ও অধিকতর যোগ্য কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব এড়াতে পারে? আমরা মনে করি, নির্বাচনকালীন ডিসি নিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সরকারের উচিত ছিল নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।
পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, প্রশাসনে একশ্রেণির ক্যাডার কর্মকর্তার দ্রুত পদোন্নতি ও ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পেতে সরকারি দলের দাস হওয়ার প্রতিযোগিতা এবং রাজনীতি চর্চার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। এ ধরণের সংস্কৃতি সহসাই দূর করা সহজ নয়; কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই এই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নিরপেক্ষতা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিকল্প নেই বলেই মনে করি আমরা। আসন্ন নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।