খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৮ জানুয়ারী ২০২৬ | ২৪ পৌষ ১৪৩২

ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখায় জমার কোটি টাকা নিয়ে কয়রার জামায়াত নেতার পুত্র ব্যবস্থাপক উধাও, বিপাকে গ্রাহকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:৪৪ এ.এম | ০৪ জানুয়ারী ২০২৬


কয়রা উপজেলার ঘড়িলাল বাজারে ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট শাখায় গ্রাহকের জমা প্রায় কোটি টাকা নিয়ে ব্যবস্থাপক পালিয়েছেন। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে ওই শাখায় অনুপস্থিত তিনি। ব্যবস্থাপক মোস্তাকিম বিল্লাহ উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমানের ছেলে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বিক্ষোভের মুখে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে ছেলেকে খুঁজে বের করে গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ ফেরত দেবার দায়িত্ব নিয়েছেন ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান।
সরেজমিনে জানা গেছে, গোলখালী বায়তুন জামে মসজিদের এক লাখ টাকা ইসলামী ব্যাংকের ওই এজেন্ট শাখায় জমা রেখেছিলেন মসজিদ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এড. টি এম মঞ্জুর আলম নান্নু। পার্শ্ববর্তী মোল্লাপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা জসিম উদ্দিন বহু কষ্টে সঞ্চিত আড়াই লাখ টাকা রেখেছিলেন। এছাড়া খাশিটানার সুনিতা রানির ১০ লাখ, ঘড়িলালের গণেশ কুমারের ২০ হাজার, চরামুখী সানাপাড়ার মরিয়াম বিবির এক লাখ টাকা, চরামুখা খালেরগোড়ার নূরুজ্জামানের দুই লাখ ২০ হাজার টাকা, মাটিয়াভাঙ্গার সালাউদ্দিনের তিন লাখ, আংটিহারা ওসমানের এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ঘড়িলাল বাজারের ব্যবসায়ী আঃ রহিমের সাড়ে তিন লাখ টাকাসহ তাৎক্ষনিকভাবে খোঁজ পাওয়া শতাধিক গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা ব্যাংক হিসাব থেকে উধাও। লাপাত্তা ওই শাখার ব্যবস্থাপক মোস্তাকিম বিল্লাহও।
মাটিয়াভাঙ্গা গ্রামের ফাহিমা বিবি জানান, প্রবাসে শ্রমিকের কাজ করতেন। কয়েক মাস আগে দেশে ফেরেন তিনি। বাড়ির পাশে হওয়ায় দক্ষিণ বেদকাশীর ঘড়িলাল বাজারে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট শাখায় তিন মাস আগে সাড়ে ৩ লাখ টাকা জমা রাখেন। হঠাৎ টাকার প্রয়োজন পড়ায় ২২ ডিসেম্বর ওই শাখায় গিয়ে জানতে পারেন, টাকা নেই। পরে খোঁজ নিয়ে শুনেছেন, ম্যানেজার টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন। 
ফাহিমা বিবি বলেন, বাড়ির পাশে ইসলামী ব্যাংকে বিশ্বাস কইরে টাকা রাখিছিলাম। কিন্তুক তারা গরিব মানষির বিশ্বাস ভেঙে ফেলাইছে।
তাঁর মতো বেশ কয়েকজন গ্রাহক টাকা তোলার জন্য চেক দিয়ে জানতে পারেন, তাদের ব্যাংক হিসাবেও টাকা নেই। বিষয়টি জানতে পেরে ওই এজেন্ট ব্যাংকের উদ্যোক্তা ফজলুর রহমান ৩০ ডিসেম্বর সেখানে আসেন। তাৎক্ষণিক তিনি ৭৫ লাখ টাকা গরমিলের হিসাব দেন। এ সময় গ্রাহকরা তাঁর কাছে টাকা ফেরতের দাবি করলে তিনি ১০ দিন সময় নিয়ে জায়গা ছেড়ে যান। বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোন নম্বরে কল দিলেও তিনি ধরেননি।
তবে স্থানীয় সমাজসেবক আমীর হামজা অভিযোগ করে বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই কত টাকা নিয়ে পালিয়েছে-তা এখনি সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে অবশ্যই কোটি টাকার উর্ধ্বে হবে। মোস্তাকিম  বিল্লাহ সুপরিকল্পিভাবে হতদরিদ্র মানুষগুলো টাকা মেরে দিয়েছে। এই মানুষগুলো এতোটাই অসহায় যে আইনের আশ্রয় নেবার মতো সামর্থ্যও নেই তাদের। তাই প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
মাটিয়াভাঙ্গা জান্নাতুল জামে মসজিদের ক্যাশিয়ার সাইফুল গাজী বলেন, আমাগে এলাকা থেকে কয়রা সদরের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। এর আগে কষ্ট কইরে কয়রা সদরের ব্যাংকে টাকা জমা রাখতাম। গত বছর এলাকার বাজারে ইসলামী ব্যাংকের শাখা হওয়ায় খুশি হইছিলাম। সেখানে মসজিদ ফান্ডের ৬৫ হাজার টাকা জমা রাখছি। ঘটনা জানতে পেরে খোঁজ নিয়া দেখি, মসজিদের টাকাও নিয়ে গেছে ম্যানেজার। বিষয়টি ম্যানেজারের বাবা জামায়াতের আমির সাহেবকে জানাইছি।
বক্তব্যের জন্য মোস্তাকিম বিল্লাহর মোবাইল ফোন নম্বরে কল দিয়ে সংযোগ মেলেনি।
তাঁর পিতা ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান বলেন, অনেকেই এ বিষয়ে আমার কাছে অভিযোগ করেছিলেন। স্থানীয়দের ওয়াদা দিয়েছি, এক সপ্তাহের মধ্যে আমি মোস্তাকিম বিল্লাহকে হাজির করে তাদের পাওয়া টাকা আদায়ে সহযোগিতা করবো।
দক্ষিণ বেদকাশী ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ওসমান গনি খোকন বলেন, গ্রাহকদের প্রাথমিক অভিযোগে ৭৫ লাখ টাকার (গরমিলের) হিসাব পাওয়া যায়। পরে আরও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সে হিসাবে গ্রাহকদের এক কোটি টাকারও বেশি নিয়ে পালিয়েছেন ব্যবস্থাপক মোস্তাকিম বিল্লাহ। তাঁর বাবা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মতিউর রহমান ছেলেকে খুঁজে আনার চেষ্টা করবেন বলে দায়িত্ব নিয়েছেন।