খুলনা | রবিবার | ১১ জানুয়ারী ২০২৬ | ২৭ পৌষ ১৪৩২

হাড়কাঁপানো শীত ও শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন, যশোরে একদিনে প্রাণ গেল ১০ জনের, ভর্তি ২৯০

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর |
০৫:১৮ পি.এম | ০৯ জানুয়ারী ২০২৬


যশোরে হাড়কাঁপানো শীত ও শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তীব্র ঠান্ডাজনিত নানা রোগে একদিনে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যাদের বয়স ৫৫ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। বিভিন্ন সময়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবারের মধ্যে তারা মারা যান। তারা ঠান্ডাজনিত ও ফুসফুসে সংক্রমনজনিত রোগে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বলে তাদের স্বজনেরা জানিয়েছেন। হাসপাতালে মৃত্যুবরণকারী সবাই ঠান্ডাজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। শুক্রবার সকালে যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জোবায়ের আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
চিকিৎসকরা বলেন, ঠান্ডার কারণে বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। তাই বাড়িতে এবং বাইরে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নানা রোগ নিয়ে ২৯০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে শতাধিক রোগী ঠান্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে ৫৪ জনই শিশু।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী গত দু’সপ্তাহ ধরেই যশোরের তাপমাত্রা ৭ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। দিনে কুয়াশা ও বাতাসে শীতের দাপট রয়েছে। এ অবস্থায় জেলাজুড়ে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত নানা রোগ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া এবং ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে হাসপাতালেও বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ২৯০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শতাধিক রোগী সরাসরি শীতকালীন রোগে আক্রান্ত, যাদের মধ্যে ৫৪ জনই শিশু। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং শ্বাসকষ্টের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
মৃত মুন্সি মহিউদ্দিনের ছেলে শামছুজ্জামান বলেন, ঠান্ডার কারণে তার বাবার শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে হাসপাতালে নিয়ে যাই, সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মারা যান।
মৃত মনিরা খাতুনের ছেলে শেখ মামুন বলেন, আমার মায়ের বয়স ৬৪ বছর। প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে তিনি ১০ দিন অসুস্থ ছিলেন। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় গুরুতর অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত শেখ সদরুল আলমের ছেলে আব্দুল­াহ আল মামুন জানান, তার বাবার হার্টের সমস্যা ছিল। এছাড়া গত কয়েক দিনের তীব্র শীতে তিনি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে হাসাপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
যশোরে গত কয়েকদিন ধরে বয়ে যাওয়া মৃদু শৈত্যপ্রবাহ আর হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। ঘন কুয়াশার সঙ্গে বাতাসের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় শীতের প্রকোপ এখন চরমে। শুক্রবার সকালে জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র এই শীতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা থমকে গেছে। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।
যশোর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, জেলায় শুক্রবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত কয়েকদিন ধরেই তাপমাত্রা ৭ থেকে ১০ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। দিনভর সূর্যের দেখা না মেলায় এবং উত্তরের হিমেল হাওয়ায় শীতের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জোবায়ের আহমেদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ঠান্ডাজনিত এবং ফুসফুস সংক্রমণজনিত কারণে ১০ জন মারা গেছেন। শীতের কারণে বয়স্কদের মধ্যে মৃত্যুর প্রবণতা বেশি। একদিনে ২৯০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে শতাধিক রোগী ঠান্ডাজনিত রোগে ভুগছিলেন। এর মধ্যে ৫৪ জন শিশু রয়েছে। মারা গেছেন ১০ জন।
চিকিৎসক জোবায়ের আহমেদ আরও জানান, শীতে ফুসফুস সংক্রমণ এবং অন্যান্য বিভিন্ন সমস্যার কারণে বয়স্কদের মধ্যেই মৃত্যুর প্রবণতা বেশি দেখা দিচ্ছে।  শৈত্যপ্রবাহের কারণে বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের ফুসফুস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। এই অবস্থায় তার পরামর্শ, ঠান্ডার ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করা যায় সেটা ঘরে হোক বা বাইরে। বাইরে চলাফেরার ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করা এবং ফুসফুস সংক্রমণজনিত কারণগুলো রোধ করার জন্য সতর্ক থাকতে হবে। এই অবস্থায় ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পর্যাপ্ত গরম কাপড় ব্যবহার এবং ঠান্ডা থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি। সামান্য লক্ষণ দেখা দিলেই অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
তবে যশোরের সিভিল সার্জন ডাঃ মাসুদ রানা জানিয়েছেন, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে একদিনে দশজনের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাটা হয়ত একটু বেশি। তবে তারা সবাই শীতের কারণে মারা যায়নি। তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিল। ফুসফুসে সংক্রমনসহ বিভিন্ন রোগে তাদের মৃত্যু হয়েছে।