খুলনা | রবিবার | ১৮ জানুয়ারী ২০২৬ | ৫ মাঘ ১৪৩২

এখনও আলোর মুখ দেখেনি পাশকৃত ভবন

অর্ধ শতাব্দীতেও উন্নয়ন হয়নি ফুলতলার গাড়াখোলা হাইস্কুলের অবকাঠামো : ব্যাহত হচ্ছে লেখাপড়া

মোঃ নেছার উদ্দিন, ফুলতলা |
১১:৫১ পি.এম | ১৬ জানুয়ারী ২০২৬


প্রতিষ্ঠার ৫১ বছর পেরিয়ে গেলেও ফুলতলার গাড়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত কোন উন্নয়ন হয়নি। সরকারি বা বেসরকারিভাবেও লেখাপড়ার পরিবেশ সৃষ্টিতে তেমন কোন সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ। ফলে শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতুতে টিনসেডের জীর্ণ-শীর্ণ কক্ষে চলছে পাঠদান। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া। উপজেলার মধ্যে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ও ভালো ফলাফল থাকা স্বত্তে¡ও অজ্ঞাত কারণে পাশকৃত ভবন এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
ফুলতলা উপজেলার গাড়াখোলা গ্রামে গাড়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ১৯৭৪ সালে ১ একর ১০ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার ১১ বছর পর ১৯৮৫ সালে বিদ্যালয়ের প্রথমে নি¤œ মাধ্যমিক স্তর এবং পরে ২০২২ সালে মাধ্যমিক স্তর এমপিওভ‚ক্ত হয়। প্রতিষ্ঠার পর স্কুলের অভ্যন্তরীণ আয় ও এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনুদানে কয়েক দশক ধরে ৬ কক্ষ বিশিষ্ট একটি টিনসেড ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ৪৫৩ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত এবং শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে ২২ জন। বিদ্যালয়ের ৬টি কক্ষের মধ্যে ৫টি কক্ষে শ্রেণি কার্যক্রম এবং বাকি ১টি রুমে অফিসসহ প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক-কর্মচারীদের কার্যক্রম চলমান। ফলে বিভিন্ন সময়ে অভিভাবকসহ অতিথিবৃন্দ এলে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় স্কুল কর্তৃপক্ষের। 
এদিকে ৫টি কক্ষে শ্রেণি কার্যক্রম চলমান থাকায় নেই মেয়ে শিক্ষার্থীদের আলাদা কোন কমনরুম, নেই কোন বিজ্ঞানাগার, নেই ছেলেদের ইনডোর খেলাধুলার জন্য কোন রুম। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সহপাঠ কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সাড়ে ৪ শতাধিক শিক্ষার্থীকে সঠিক শিক্ষা প্রদানে প্রয়োজন শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ, প্রয়োজন আধুনিক সুযোগ সুবিধা সমৃদ্ধ নতুন একাডেমিক ভবন।
এদিকে স্কুলে আধুনিক ভবন না থাকায় অতি গরমে শিক্ষার্থীরা ক্লাস রুমে বসতে হাসফাঁস করে। আবার বৃষ্টিতে টিন দিয়ে পানি পড়ে। তীব্র শীতে জানালা দরজা দিয়ে হিমেল বাতাস প্রবেশ করায় শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমে যায়। তারপরেও প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষকবৃন্দের আন্তরিকতায় উপজেলার মধ্যে ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে স্কুলটিতে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ১৬ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ সহ পাশের হার ৮৭% বলে অফিস সূত্রে জানা যায়। শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টিতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসমৃদ্ধ একটি ভবন হলে এ স্কুল থেকে শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল নিয়ে দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারতো বলে এলাকার সচেতন মহলের প্রত্যাশা।       
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, গাড়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি অনেক পুরাতন হওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষ ভেঙে পড়ার উপক্রম। ঝড় বৃষ্টির সময় পাঠদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাছাড়া বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট হয়। তবুও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার কথা বিবেচনা করে আমরা সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করি। দরজা জানালা নষ্ট থাকায় শীতের সময় বাতাসে শিক্ষার্থীরা কাপতে থাকে।
স্কুলের ১০ম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈমা ইসলাম আঁখি বলেন, আমি এই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে বর্তমানে ১০ম শ্রেণিতে পড়ি। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি থাকলেও কোন বিজ্ঞানাগার নেই। বিজ্ঞানাগার না থাকায় আমাদের ব্যবহারিক কোন ক্লাস হয় না। চারপাশের স্কুলগুলো অনেক সুন্দর। আমাদের স্কুলটি পুরাতন ও টিনের চালা দিয়ে তৈরী। স্কুলের পরিবেশ সুন্দর হলে শিক্ষার মান আরও সুন্দর হবে। ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাসেল জমাদ্দার বলেন, বৃষ্টির সময় ক্লাস রুমে পানি পড়ে বই খাতা ভিজে যায়। আর রোদের সময় প্রচন্ড গরমে শ্রেণিকক্ষে বসা যায় না। তাছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পৃথক পৃথক টয়লেট থাকা প্রয়োজন। সরকারের কাছে স্কুলের জন্য একটা নতুন ভবনের দাবি জানাই। 
ইংরেজী শিক্ষক লোপা সাহা বলেন, আনন্দময় শিক্ষার জন্য সুন্দর পরিবেশ প্রয়োজন। সুন্দর ভবন থাকলে শিক্ষার্থীরা আরও মনোযোগী হয়ে পড়বে। সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গাজী আজাদ হোসেন বলেন, স্কুলের জন্য নিজেদের অর্থায়নে একটি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থের অভাবে সেটির ছাউনী দেয়া সম্ভব হয়নি। সরকারিভাবে কোন সাহায্য পেলে উপকার হতো। 
প্রধান শিক্ষক তাপস কুমার বিশ্বাস বলেন, ২০১৮ সালে স্কুলের দায়িত্ব নেয়ার সময় ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত আমি ৭২ শিক্ষার্থী পাই। পরবর্তীতে শিক্ষকবৃন্দকে সাথে নিয়ে স্কুলের শিক্ষার্থী বৃদ্ধিতে এলাকার অভিভাবকদের কাছে গেলে স্কুলের অবকাঠামো অনুন্নয়নের জন্য শিক্ষার্থী দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। দু’এক বছরে গুণগত শিক্ষা প্রদানে অভিভাবকরা পরবর্তীতে তাদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করানো শুরু করে। তবে স্কুলের ভবন না থাকায় আমরা শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট নতুন ভবনের জন্য দাবি জানাচ্ছি।      
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ফাতেমা বেগম বলেন, শিক্ষার জন্য সুন্দর পরিবেশ দরকার। স্কুলটির শিক্ষার মান যথেষ্ট ভাল। সকল দিক দিয়ে বিদ্যালয়টি সেরা হলেও শুধুমাত্র ভবনের অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। বিদ্যালয়ে একটি নতুন ভবন অত্যন্ত প্রয়োজন।