খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৭ জানুয়ারী ২০২২ | ১৪ মাঘ ১৪২৮

কেমন আছে আমাদের পথকলিরা?

স্নিগ্ধা মৌ |
১০:৫৬ পি.এম | ১৬ অক্টোবর ২০২১


ভয়ঙ্কর এক দুঃসময় পার করছি আমরা, অদৃশ্য এক শক্তির সাথে লড়াই। তবে বিশ^াস করি জয় হবেই, এই মহামারী ভাইরাসকে আজ না হয় কাল আমরা ঠিকই বশে আনতে পারবো। কিন্তু আমাদের ভিতরের যে অমানবিকতাগুলো রয়েছে, যে নৃশংসতা রয়েছে, ঘুণ পোকার মতো আমাদের ভিতরকে ঝাঁঝরা করে ফেলছে, সেগুলো কি কোনদিনই বিদায় নিবে আমাদের থেকে? আদৌ কি আর কখনো, কোনদিন আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পারবো? অত্যন্ত সচেতন থেকেও আমরা রক্ষা করতে পারছি না আমাদের ছোট ছোট সোনামনিদের, তবে কেমন আছে আমাদের পথকলিরা? কেমন ভাবেই বা নিজেদের রক্ষা করছে কন্যা পথশিশুরা?

বাংলাদেশ জাতীয় শিশুনীতিতে ১৪ বছরের কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের এবং বাংলাদেশ সংবিধানে ০-১৮ বছরের কম বয়সী সকলকে শিশু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

ইউনিসেফ’র মতে, পথশিশু বলতে, যে সকল শিশুর জন্য রাস্তা বসবাসের স্থান অথবা জীবিকার জন্য উপায় হয়ে গেছে তাদের পথশিশু বলে। ধর্ষনের সঙ্গা? না, সে সঙ্গা দিতে চাই না, কলমের আঁচড়ে ব্যাখা করতে অক্ষম এক নরপশুর চরম নৃশংসতার সঙ্গা। তবে ছোট পরিসরে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরতে চাই।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসেব মতে, ২০১৭ সালে ৮১৮ জন এবং ২০১৮ সালে ৭৩২ জন নারী ধর্ষনের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালের চেয়ে শিশু ধর্ষনের পরিমাণ বেড়েছে ৭৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিমাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষনের শিকার হয়েছে (সূত্র : বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম)। ২০২০ সালের শুধুমাত্র জুন মাসেই সারা দেশে ৩০৮ জন নারী ও কন্যা শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে (সূত্র : জাগোনিউজ)।

২০২১ সালের শুধুমাত্র জানুয়ারি মাসে ২৫৯ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার, ধর্ষনের শিকার ১০৮ জন (সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন)।

আমরা নাকি মহামারীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, আমরা নাকি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা নাকি সৃষ্টিকর্তার কাছে মহাপ্রলয়ের অবসানের জন্য অনুনয় করছি। তবে কেন এখনো করোনা আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালের মধ্যেই চলছে ধর্ষনের চেষ্টা? এই ক্রান্তিলগ্নেও আমরা নারীরা, কন্যা শিশুরা শুধুই এক কামনার বস্তু, মানুষ না নিছকই এক নারী মাংস।

ফিরে যাই ২০২০ সালের প্রথম দিকে, বছরের প্রথম ১০ দিনে দেশে ১২৮টি ধর্ষণ হয়। সারা বছরে তাহলে কতগুলো ধর্ষণ হয়? না এই হিসেব করতে অক্ষম। তবে চাই আপনি/আপনারা হিসেব করুন। আর সংখ্যাটা দেখে স্তব্ধ হয়ে উঠুক আপনার ইন্দ্রিয়, আপনার হাত-পা অবশ হয়ে আসুক, আপনার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠুক। নিজের মা, বোন, স্ত্রী আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠুক আপনার প্রাণ। চাই, সত্যিই তাই চাই। আসুন এবার আরো একটু গভীরভাবে চিন্তা করি। এগুলো সবই নথিভুক্ত ধর্ষনের হিসেব। নথিভুক্ত হয়নি এমন ধর্ষনের সংখ্যা তবে কত? মুখ বুজে মেনে নেয়া সংখ্যাটা আপনি আমি হিসেব করেও বের করতে পারবো না। বীভৎস এক স্মৃতি নিয়ে অসহায় এসব মানুষ সারাজীবন তিল তিল করে শেষ হয়ে যায় নীরবে, নিভৃতে।

চলে যাই মূল প্রসঙ্গে, আমরা অনেক সচেতন হয়েছি। আমরা আমাদের শিশুদের এখন অনেক বেশি সর্তকতায় রাখি। একা একা কোথাও যেতে দেই না, অপরিচিত মানুষের কাছে তো নয়ই। কিন্তু ঐ সব পথকলিদের কি হবে? যখন আপ্রাণ চেষ্টা করেও আমরা সুরক্ষিত রাখতে পারছি না আমাদের পরিবারে থাকা শিশুদের, তখন ঐ মানুষরূপী পশুদের হাত থেকে কেমন করে সুরক্ষিত আছে আমাদের কন্যা পথশিশু? কি ভয়াল থাবার অপেক্ষায় দিন গুণছে কিংবা নিঃশব্দে মেনে নিছে পৈশাচিক আক্রমণ। তাদের নিপীড়নের জন্য রাতের অন্ধকারটুকুই হয়তো যথেষ্ট। আমরা আমাদের শিশুকে ভাল স্পর্শ, মন্দ স্পর্শ, অনাকাক্ষিত স্পর্শের শিক্ষা দিচ্ছি, শেখাচ্ছি ধর্ষণ কাকে বলে। কিন্তু ওই পথের ধারের ফুলগুলো? ওরা কি জানে ওদের অধিকার কি কি? ওদের সাথে যেগুলো ঘটে সেটা আসলে অন্যায়? ওদেরও অধিকার আছে প্রতিবাদ করার, সুস্থ জীবন যাপনের অধিকার। একটা বিষয় কি কখনো খেয়াল করেছেন? একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর আর রাস্তায় মেয়ে পথশিশুদের দেখতে পাওয়া যায় না। আমরা যদি ধরে নেই, ওদের বিয়ে হয়ে গেছে, এ বাল্যবিবাহও যেন আশির্বাদ। কিন্তু যদি সেটা না হয়। আসলেই কি তাদের নিয়ে কেউ সংসার গড়ে? তাহলে? তাহলে কি ঠাঁই হয় কোন অন্ধগলিতে? লাভের মধ্যে লাভ, ছোটবেলায় কেউ যখন জোর করতো হয়তো ঐ ছোট ফুলগুলো বুঝতেও পারতো না কি হচ্ছে। আর এখন এগিয়ে যায় নিজেই বাধ্য হয়ে, জীবিকার প্রয়োজনে। আমাদের কি সত্যিই কোন দায়বদ্ধতা নেই? আমাদের কি সত্যিই কিছু করণীয় নেই?

আর কত? সত্যিই আর কত? জান্নাতের ফুলগুলোর মধ্যেও আমরা যৌনতা খুঁজি। মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যিই ভাল হয়েছে করোনা নামক প্রাণঘাতী ভাইরাসের এই আক্রমনে। আসলেই দরকার ছিল এই মহামারীর। আমরা আর মানুষ নেই, আমাদের বেঁচে থাকার কোন অধিকারও আর নেই। বিশ^াস করতে ইচ্ছে হয় অদৃশ্য যে শয়তানের কথা আমরা বলি, সেও বোধহয় আমাদের নৃশংসতা দেখে শিউরে ওঠে।

তবে সমাধান কি? পথশিশুদের নিরাপত্তা দিতে হবে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। তারপর! তারপর মেয়েদের ঘরে আটকে রেখে বলতে হবে বাইরে রয়েছে মানুষরূপী পিশাচ। সমাধান কি শুধু মেয়েদের আগলে রেখে হবে? প্রতিরোধের জন্য চেষ্টা করতে হবে বহুমাত্রিকভাবে। আপনার মেয়েকে সচেতন করার আগেই আপনার ছেলেকে শেখান কিভাবে নারীকে সম্মান করতে হয়, শেখান নারীও একজন মানুষ, যার ইচ্ছে আছে। মায়েরা নিঃসঙ্কোচে তাদের পুত্র সন্তানকে শোনাক তাদের মেয়েবেলার গল্প। কেমন লাগত ঐ নোংরা দৃষ্টি, ভাষা আর অযাচিত স্পর্শ। পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে যে, ছেলেদের এই শিক্ষার প্রয়োজন আছে। হয়তো পরিপূর্ণ সমাধান এটা নয় তবুও বলতে তো পারবো চেষ্টা করেছিলাম। আমি-আপনি হয়তো মানুষ হতে পারলাম না, তবু ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানুষ করার চেষ্টা করি, যেন ওরা বলতে পারে আমরা মানুষ, মানুষরূপী কোন পশু না।