খুলনা | মঙ্গলবার | ০৪ অক্টোবর ২০২২ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

খায়েশাত

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:১২ এ.এম | ১৫ জানুয়ারী ২০২২


একবার এক কুরাইশী যুবক রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­ামের খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করল, ইয়া রসূলাল­াহ ‘আমাকে জেনার অনুমতি দিয়া দিন’। সাহাবায়েকেরাম রাযিয়াল­াহু আনহু ভীষণ রেগে গেলেন কিন্তু রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম যুবককে মহব্বতের সাথে কাছে ডাকলেন এবং বললেন তুমি কি এটা পছন্দ কর যে, কেউ তোমার মায়ের সাথে জেনা করে? যুবক বলল তা কখনো হতে পারে না। রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম আবার বললেন তুমি কি এটা পছন্দ কর যে, কেউ তোমার মেয়ের সাথে জেনা করে? যুবক বললো আমি তা কখনোও পছন্দ করি না। রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম এই ভাবে বোন, খালা, ফুফুর ব্যাপারে যুবককে জিজ্ঞাসা করলেন। প্রতিবারই যুবক উত্তর দিলো এটা কখনো হতে পারে না। রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম বললেন অনুরুপ ভাবে কেউ পছন্দ করে না কেউ তার মায়ের সাথে জিনা করুক, কেউ তার মেয়ের সাথে জিনা করুক, কেউ তার খালার সাথে জিনা করুক, কেউ তার ফুফুর সাথে জিনা করুক। রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম যুবকের বুকে হাত রেখে দোওয়া কোরলেন ‘হে আল­াহ তার অন্তর কে পবিত্র করে দিন, গোনাহ মাপ করে দিন এবং লজ্জাস্থানকে গোনাহ থেকে হেফাজত করুন।’(আহমদ)
খায়েশাত হচ্ছে, মানুষের দৈহিক একটি স্বভাব যার উপর ভিত্তি করেই মহান আল­াহ রব্বুল আলামীন তার স্বীয় বান্দাদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে মানব সৃষ্টির রহস্য, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সাধিত হয়। 
মহান আল­াহ তা’য়ালা পুরুষ ও নারী উভয়কে তার নিজ নিজ দৈহিক সৌন্দর্য দান করেছেন। পুরুষকে করছেন নারীর জন্য আকর্ষণীয় আর নারীকে করেছেন পুরুষের জন্য আকর্ষণীয়। এ কারণেই তারা একে অপরের প্রতি আকর্ষিত হয়। 
মহান আল­াহ রব্বুল আলামীন কুরআনের কারীমে এরশাদ করেছেন, ‘মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে কামনা-বাসনা ও আসক্তির ভালোবাসা-নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যখেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগ সামগ্রী। আর আল­াহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল’। (সূরা আলে ইমরান: ১৪)
মানুষের আবেগ-আনুভূতি, উত্তেজনা, বাসনা-কামনা মাত্রই পাপ, বেহুদা ও নিরর্থক নয়; বরং এই সমস্তকে সৃজনশীল প্রবৃত্তি বলেই ইসলাম মনে করে থাকে এবং এগুলোর যথার্থ প্রয়োগের নির্দেশ দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে ইসলাম সীমা নির্ধারন করে দিয়েছে।
এক হচ্ছে বৈধ উপায়ে যৌনচাহিদা পূরণ করা যার অনুমতি রয়েছে এবং তা প্রশংসিত আর এক হচ্ছে অবৈধ্য উপায়ে যৌনচাহিদা পূরণ করা যা হারাম এবং নিন্দনীয়।
মানুষের যৌনচাহিদা মহান আল­াহর দেওয়া একটি নিয়ামত। একদিকে এটি মানুষের একটি স্বভাবজাত চাহিদা। যে চাহিদা থেকে কোন মানুষই মুক্ত নয়। যত বড় পয়গম্বর হোন, ওলী হোন বা বুযুর্গ হোন কেউ এ চাহিদা থেকে মুক্ত নন। প্রত্যেকের মনেই এ চাহিদা পাওয়া যায়। 
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহমাতুল­াহি আলাইহি বলেন, ‘আমরা আমাদের দুনিয়ার জীবনের সামগ্রিক কল্যাণ অর্জনে যাতে সহযোগিতা লাভ করতে পারি, তাই মহান আল­াহ রব্বুল আলামীন আমাদের মধ্যে আসক্তি ও কামনা-বাসনাকে সৃষ্টি করেছেন। (আসক্তি)
কারণ আল­াহ তা’য়ালা মানুষের এ যৌন চাহিদাকেই মানবের বংশ বিস্তারের মাধ্যম বানিয়েছেন। যদি মানুষের মধ্যে কামনা-বাসনা না থাকত, তাহলে সে কখনোই বিয়ে করত না, সন্তান লাভের প্রতি তার কোন আকর্ষণ থাকত না এবং সন্তানের চাহিদা থাকত না। ফলে আমাদের বংশ-পরিক্রমা ও তার ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যেত এবং দুনিয়ার স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ হত। এ চাহিদা পূরণের ফলই হল মানুষের বংশ বৃদ্ধি। তাই এ চাহিদা স্বভাবজাত। আর যেহেতু এটি স্বভাবজাত চাহিদা তাই শরী’আত এটাকে খারাপ চাহিদা বলেনি। ঘৃণ্য, নাপাকি বা হারাম সাব্যস্ত করেনি। তবে এ চাহিদা মেটাতে মাহান আল­াহ একটি বৈধ পন্থা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ বৈধ পন্থায় এ চাহিদা যত পূরণ করতে চাও তা তোমাদের জন্য হালাল। তা একটি সীমার ভিতরে থাকবে এবং শুদ্ধতার সাথে ব্যবহার করবে।
কিন্তু তা যদি সীমা ছাড়িয়ে পশুত্বে রুপলাভ করে, তবে তার পরিণতি হবে খুবই মারাক্তক। মানুষ যখন খায়েশাতের দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন তার ঈমান, দ্বীন-ধর্ম সব বরবাদ হয়ে যায়। তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য বিনষ্ট হয়ে যায়, আয়ুষ্কাল সংকীর্ণ হয়ে যায় এবং দারিদ্রতা চিরস্থায়ী হয়। যিনা-ব্যভিচারের মাধ্যমে প্রাণঘাতি বিভিন্ন যৌন রোগ সৃষ্টি হয় যার মধ্যে মরণঘাতি এইডস্, সিফিলিস, গণোরিয়া, মেহ-প্রমেহ, ক্ষয়রোগ ইত্যাদি প্রধান। মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যকার পার্থক্য থাকেনা। যৌন পিপাসা মিটানোর নেশায় সাধারণ মানবিক লজ্জা-শরম হারিয়ে যায়। ব্যভিচারের কারণে বিবাহ, পরিবার, সন্তান-সন্তুতির প্রতি মানুষের অবজ্ঞা সৃষ্টি হয় ফলে যৌন সম্ভোগের বৈধ পথ রূদ্ধ হয়ে যায়। সর্বোপরি তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম।
পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল­াহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই জাহান্নাম তাদের সকলের নির্ধারিত স্থান। তার সাতটি দরজা রয়েছে। প্রত্যেকটি দরজার জন্য তাদের মধ্য থেকে পৃথক পৃথক দল রয়েছে। (সূরা হিজর: ৪৩-৪৪)
এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আতা রহমাতুল­াহি আলাইহি বলেছেন, ‘এ সাতটি দরজার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত, সবচেয়ে বেশি দুঃখে পরিপূর্ণ ও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দরজা হবে যারা জেনে-শুনে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাদের দরজা’।
রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম বলেছেন, ‘যিনারাকীরা উলংগ অবস্থায় এমন এক চুলার মধ্যে থাকবে যার অগ্রভাগ হবে অত্যন্ত সংকীর্ণ আর নিম্নভাগ হবে প্রশস্ত উহার তলদেশে অগ্নি প্রজ্বলিত থাকবে তাদেরকে তাতে দগ্ধ করা হবে। তারা মাঝে মধ্যে সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার কাছাকাছি অবস্থায় পৌছে যাবে; অতঃপর আগুন যখন স্তমিত হয়ে যাবে তখন তাতে তারা আবার ফিরে যাবে। আর তাদের সাথে এই আচারণ কেয়ামত পর্যন্ত করা হবে।’(বুখারী)
খায়েশাতের পরিণতি খুবই মারাক্তক। মানুষ যখন খায়েশাতের দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন তার ঈমান, দ্বীন-ধর্ম, আখিরাত সব বরবাদ হয়ে যায়। এজন্য আমাদের খায়েশাত হতে বেঁচে থাকা উচিত।
মহান আল­াহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে আমাদের পরম চাওয়া হল, মহান আল­াহ তা’য়ালা আমাদের কৃতপাপ সমূহ ক্ষমা করুন এবং সবাইকে কু-আসক্তির মত ঘৃণিত পাপ হতে বিরত থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন। 
লেখক: বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, খুলনা।